সূরা আল ফাতিহা বাংলা তাফসীর ইবনে কাসির
1:1
بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَـٰنِ ٱلرَّحِيمِ ١
(আরম্ভ করছি) পরম করুণাময় অসীম দয়াময় আল্লাহর নামে।
1:2
ٱلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلْعَـٰلَمِينَ ٢
যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।
1:3
ٱلرَّحْمَـٰنِ ٱلرَّحِيمِ ٣
যিনি পরম করুণাময় অতি দয়ালু।
1:4
مَـٰلِكِ يَوْمِ ٱلدِّينِ ٤
যিনি প্রতিফল দিবসের মালিক।
1:5
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ ٥
আমরা কেবল তোমারই ‘ইবাদাত করি এবং কেবলমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।
1:6
ٱهْدِنَا ٱلصِّرَٰطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ ٦
আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন কর ও তার প্রতি অটুট থাকার তাওফীক দান কর।
1:7
صِرَٰطَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ ٱلْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا ٱلضَّآلِّينَ ٧
তাদের পথ, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ। তাদের পথ, যারা গযবপ্রাপ্ত (ইয়াহূদী) ও পথভ্রষ্ট (খ্রিস্টান) নয়।
Bengali - Tafsir Ibn Kathir
(1) এই সূরাটির নাম ‘সূরা-ই-আল ফাতিহাহ্। কোন কিছু আরম্ভ করার নাম ‘ফাতিহাহ’ বা উদ্ঘাটিকা। কুরআন কারীমের মধ্যে প্রথম এই সূরাটি লিখিত হয়েছে বলে একে সূরা-ই-আল ফাতিহাহ্ বলা হয়। তাছাড়া নামাযের মধ্যে এর দ্বারাই কিরাআত আরম্ভ করা হয় বলেও একে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে। উম্মুল কিতাব’ও এর অপর একটি নাম। জমহুর বা অধিকাংশ ইমামগণ এ মতই পোষণ করে থাকেন। কিন্তু হাসান বসরী (রঃ) এবং ইবনে সীরীন (রঃ) একথা স্বীকার করেন না। তাঁরা বলেন যে, ‘লাও-হি মাহফুয বা সুরক্ষিত ফলকের নামও উম্মুল কিতাব। হাসানের উক্তি এই যে, প্রকাশ্য আয়াতগুলোকে উম্মুল কিতাব বলা হয়। জামেউত তিরমিযীর একটি বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ এই সূরাটি হলো উম্মুল কুরআন, উম্মুল কিতাব, সাবআ মাসানী এবং কুরআন আযীম'। এই সূরাটির নাম ‘সূরাতুল হামদ’ এবং সূরাতুস্ সালাত'ও বটে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি সালাতকে (অর্থাৎ সূরা-ই-ফাতিহাকে আমার মধ্যে এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অর্ধেক অর্ধেক করে ভাগ করে দিয়েছি। যখন বান্দা বলে اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। এই হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, সূরা-ই-ফাতিহার নাম সূরা- ই-সালাতও বটে। কেননা এই সূরাটি নামাযের মধ্যে পাঠ করা শর্ত রয়েছে। এই সূরার আর একটি নাম সূরাতুশ শিফা। দারিমীর মধ্যে হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, সূরা-ই-ফাতিহা প্রত্যেক বিষ ক্রিয়ায় আঁরেগ্যিদানকারী। এর আর একটি নাম সূরাতুর রকিয়্যাহ'। হযরত আবূ সাঈদ (রাঃ) সাপে কাটা রুগীর উপর ফু দিলে সে ভাল হয়ে যায়। এ দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ এটা যে রকিয়্যাহ (অর্থাৎ পড়ে ফুঁ দেয়ার সূরা) তা তুমি কেমন করে জানলে?'
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ সূরাকে আসাসুল কুরআন বলতেন। অর্থাৎ কুরআনের মূল বা ভিত্তি। আর এই সূরার ভিত্তি হলো بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ সুফইয়ান বিন উয়াইনাহ (রঃ) বলেন যে, এই সূরার নাম অফিয়াহ্। ইয়াহ্ইয়া বিন কাসীর (রাঃ) বলেন যে, এর নাম কাফিয়াও বটে। কেননা, এটা অন্যান্য সূরাকে বাদ দিয়েও একাই যথেষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু অন্য কোন সূরা একে বাদ দিয়ে যথেষ্ট হয় না। কোন কোন মুরসাল (যে হাদীসের সনদের ইনকিতা' শেষের দিকে হয়েছে অর্থাৎ সাহাবীর নামই বাদ পড়েছে এবং তাবেঈ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নাম করে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাকে হাদীসে’ মুরসাল বলে) হাদীসের মধ্যেও একথা এসেছে যে, উম্মুল কুরআন সবারই স্থলাভিষিক্ত হতে পারে, কিন্তু অন্যান্য সূরাগুলো উম্মুল কুরআনের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। (আল্লামা যামাখশারীর তাফসীর-ই-কাশশাফ দ্রব্য)
একে সূরাতুস সালাত এবং সূরাতুল কাজও বলা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), কাতাদাহ (রঃ) এবং আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এই সূরাটি মাক্কী। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), আতা’ বিন ইয়াসার (রঃ) এবং ইমাম যুহরী (রঃ) বলেন যে, এই সূরাটি মাদানী। এটাও একটি অভিমত যে, এই সূরাটি দুইবার অবতীর্ণ হয়েছে। একবার মক্কায় এবং অন্যবার মদীনায়। কিন্তু প্রথমটিই বেশী সঠিক ও অভ্রান্ত। কেননা অন্য আয়াতে আছে وَ لَقَدْ اٰتَیْنٰكَ سَبْعًا مِّنَ الْمَثَانِیْ অর্থাৎ ‘আমি তোমাকে সাবআ মাসানী (বারবার আবৃত্ত সাতটি আয়াত) প্রদান করেছি'।' (১৫:৮৭) আল্লাহ তা'আলাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জানেন।
আবু লাইস সমরকন্দীর (রঃ) একটি অভিমত কুরতুবী (রঃ) এও নকল করেছেন যে, এই সূরাটির প্রথম অর্ধাংশ মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং শেষ অর্ধাংশ মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু হাদীসের পরিভাষায় এই কথাটিও সম্পূর্ণ গারীব বা দুর্বল। এ সূরার আয়াত সম্পর্কে সবাই একমত যে ওগুলি ৭টা। কিন্তু আমর বিন উবায়েদ ৮টা এবং হুসাইন যফী ৬টাও বলেছেন। এ দুটো মতই সাধারণ মতের বহির্ভূত ও পরিপন্থী بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ এই সূরাটির পৃথক আয়াত কিনা তাতে মতভেদ রয়েছে। সমস্ত কারী, সাহাবী (রাঃ) এবং তাবেঈর (রঃ) একটি বিরাট দল এবং পরবর্তী যুগের অনেক বয়োবৃদ্ধ মুরব্বী একে সূরা -ই-ফাতিহার প্রথম, পূর্ণ একটি পৃথক আয়াত বলে থাকেন। কেউ কেউ একে সূরা-ই-ফাতিহারই অংশ বিশেষ বলে মনে করেন। আর কেউ কেউ একে এর প্রথমে মানতে বা স্বীকার করতেই চান না। যেমন মদীনা শরীফের কারী ও ফকীহগণের এই তিনটিই অভিমত। ইনশাআল্লাহ পূর্ণ বিবরণ সামনে প্রদত্ত হবে। এই সূরাটির শব্দ হলো পঁচিশটি এবং অক্ষর হলো একশো তেরটি। ইমাম বুখারী (রঃ) সহীহ বুখারীর কিতাবুত তাফসীরের মধ্যে লিখেছেনঃ “এই সূরাটির নাম উম্মুল কিতাব' রাখার কারণ এই যে, কুরআন মাজীদের লিখন এ সূরা হতেই আরম্ভ হয়ে থাকে এবং নামাযের কিরআতও এ থেকেই শুরু হয়।
একটি অভিমত এও আছে যে, যেহেতু পূর্ণ কুরআন কারীমের বিষয়াবলী সংক্ষিপ্তভাবে এর মধ্যে নিহিত রয়েছে, সেহেতু এর নাম উম্মুল কিতাব হয়েছে। কারণ, আরব দেশের মধ্যে এ প্রথা চালু আছে যে, তারা একটি ব্যাপক কাজ বা কাজের মূলকে ওর অধীনস্থ শাখাগুলির ‘উম্ম’ বা ‘মা’ বলে থাকে। যেমন اُمُّ الرَّاْسِ তারা ঐ চামড়াকে বলে যা সম্পূর্ণ মাথাকে ঘিরে রয়েছে এবং সামরিক বাহিনীর পতাকাকেও তারা اُمُّ বলে থাকে যার নীচে জনগণ একত্রিত হয়। কবিদের কবিতার মধ্যেও একথার ভুরি ভুরি প্রমাণ পাওয়া যায়। মক্কা শরীফকেও উম্মুল কুরা বলার কারণ এই যে, ওটাই সারা বিশ্ব জাহানের প্রথম ঘর। পৃথিবী সেখান হতেই ব্যাপ্তি ও বিস্তার লাভ করেছে। নামাযের কিরআত ওটা হতেই শুরু হয় এবং সাহাবীগণ কুরআন কারীম লিখার সময় একেই প্রথমে লিখেছিলেন বলে একে ফাতিহাও বলা হয়। এর আর একটি সঠিক নাম ‘সাবআ মাসানীও রয়েছে, কেননা এটা নামাযের মধ্যে বারবার পঠিত হয়। একে প্রতি রাকাতেই পাঠ করা হয়। মাসানীর অর্থ আরও আছে যা ইনশাআল্লাহ যথাস্থানে বর্ণিত হবে। মুসনাদে-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উম্মুল কুরা' সম্পর্কে বলেছেনঃ 'এটাই উম্মুল কুরআন এটাই সাবআ মাসানী এবং এটাই কুরআনে আযীম। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এটাই ‘উম্মুল কুরআন, এটাই 'ফাতিহাতুল কিতাব’ এবং এটাই সাবআ মাসানী।
তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াইতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ اَلۡحَمۡدُ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِيۡنَ-এর সাতটি আয়াত। بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ ও ওগুলোর মধ্যে একটি আয়াত। এরই নাম সাবআ মাসানী’, এটাই, কুরআনে আযীম, এটাই ‘উম্মুল কিতাব, এটাই ‘ফাতিহাতুল কিতাব’ এবং এটাই কুরআনে আযীম।
ইমাম দারকুতনীও (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থে এরূপ একটি হাদীস এনেছেন এবং তিনি তার সমস্ত বর্ণনাকারীদেরই নির্ভরযোগ্য বলেছেন। বায়হাকীতে রয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরায়রাহ (রাঃ) সাবআ মাসানী’র ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ ‘এটা সূরা-ই-ফাতিহা এবং بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ -এর সপ্তম আয়াত। بِسْمِ اللّٰهِ -এর আলোচনায় এর বর্ণনা পূর্ণভাবে দেওয়া হবে।
হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলঃ আপনার লিখিত কুরআন কারীমের প্রারম্ভে আপনি সূরা-ই-ফাতিহা লিখেননি কেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ যদি আমি লিখতাম তবে প্রত্যেক সূরারই প্রথমে ওটাকে লিখতাম। আবু বকর বিন আবি দাউদ (রঃ) বলেনঃ একথার ভাবার্থ এই যে, . নামাযের মধ্যে তা পাঠ করা হয় এবং সমস্ত মুসলমানের এটা মুখস্থ আছে বলে তা’ লিখার আর প্রয়োজন হয় না। দালাইলুন নবুওয়াত’ এ ইমাম বায়হাকী (রঃ) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে রয়েছে যে, এই সুরাটি সর্বপ্রথম অবর্তীণ হয়েছে। বাকিলানীর (রঃ) তিনটি উক্তি বর্ণিত হয়েছেঃ (১) সূরা-ই-ফাতিহা সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। (২) یٰۤاَیُّهَا الْمُدَّثِّرُ সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। (৩) اِقْرَاْ بِاسْمِ সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। শেষ উক্তিটিই সঠিক। এর পূর্ণ বিবরণ ইনশাআল্লাহ যথাস্থানে আসবে।
সূরা-ই-ফাতিহার ফযীলত ও মাহাত্ম্যঃ
মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমি নামায পড়ছিলাম, এমন সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে ডাক দিলেন, আমি কোন উত্তর দিলাম না। নামায শেষ করে আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ এতক্ষণ তুমি কি কাজ করছিলে? আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি নামাযে ছিলাম। তিনি বললেনঃ আল্লাহ তা'আলার এই নির্দেশ কি তুমি শুননি?
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اسْتَجِیْبُوْا لِلّٰهِ وَ لِلرَّسُوْلِ اِذَا دَعَاكُمْ
অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সঃ) ডাকে সাড়া দাও যখন তাঁরা তোমাদেরকে আহ্বান করেন। (৮:২৪) জেনে রেখো, মসজিদ হতে যাবার পূর্বেই আমি তোমাদেরকেই বলে দিচ্ছি, পবিত্র কুরআনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সূরা কোটি। অতঃপর তিনি আমার হাত ধরে মসজিদ হতে চলে যাবার ইচ্ছে করলে আমি তাকে তার অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম। তিনি বললেনঃ ‘ঐ সূরাটি হলো اَلۡحَمۡدُ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِيۡنَ এটাই সাবআ’ মাসানী এবং এটাই কুরআন আযীম যা আমাকে দেয়া হয়েছে। এভাবেই এই বর্ণনাটি সহীহ বুখারী শরীফ, সুনান-ই আবি দাউদ এবং সুনান-ই-ইবনে মাজার মধ্যেও অন্য সনদে বর্ণিত হয়েছে। ওয়াকেদী (রঃ) এই ঘটনাটি হযরত উবাই ইবনে কা'বের (রাঃ) বলে বর্ণনা করেছেন। মুআত্তা-ই-ইমাম মালিকে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রাঃ) কে ডাক দিলেন। তিনি নামায পড়ছিলেন। নামায শেষ করে তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তিনি বলেনঃ তিনি (নবী সঃ) স্বীয় হাতখানা আমার হাতের উপর রাখলেন। মসজিদ হতে বের হতে হতেই বললেনঃ আমি চাচ্ছি যে, মসজিদ হতে বের হওয়ার পূর্বেই তোমাকে এমন একটি সূরার কথা বলবো যার মত সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনে নেই। এখন আমি এই আশায় আস্তে আস্তে চলতে লাগলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম-“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সেই সূরাটি কি? তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ নামাযের প্রারম্ভে তোমরা কি পাঠ কর?' আমি বললাম اَلۡحَمۡدُ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِيۡنَ তিনি বললেনঃ “এই সূরা সেটি। সাবআ’ মাসানী এবং কুরআন আযীম যা আমাকে দেয়া হয়েছে তাও এই সূৱাই বটে। এই হাদীসটির শেষ বর্ণনাকারী হলেন আবু সাঈদ (রঃ)। এর উপর ভিত্তি করে ইবনে আসীর এবং তাঁর সঙ্গীগণ প্রতারিত হয়েছেন এবং তাঁকে আবু সাঈদ বিন মুআল্লা মনে করেছেন। এ আবু সাঈদ অন্য লোক, ইনি খাসাইর কৃতদাস এবং তাবেঈগণের অন্তর্ভুক্ত। আর উক্ত আবু সাঈদ আনসারী (রাঃ) একজন সাহাবী। তার হাদীস মুত্তাসিল (যে হাদীসের সনদের মধ্যে কোন স্তরে কোন রাবী বাদ না পড়ে অর্থাৎ সকল রাবীর নামই যথাস্থানে উল্লেখ থাকে তাকে হাদীসে মুত্তাসিল বলে) এবং বিশুদ্ধ। পক্ষান্তরে এই হাদীসটি বাহ্যতঃ পরিত্যাজ্য যদি আবু সাঈদ তাবেঈর হযরত উবাই (রাঃ) হতে শুনা সাব্যস্ত না হয়। আর যদি শুনা সাব্যস্ত হয় তবে হাদীসটি যথার্থতার শর্তের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। এই হাদীসটির আরও অনেক সূত্র রয়েছে। মুসনাদ-ই- আহমাদে রয়েছে, হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উবাই বিন কা'বের (রাঃ) নিকট যান যখন তিনি নামায পড়ছিলেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “হে উবাই (রাঃ)! এতে তিনি (তার ডাকের প্রতি মনোযোগ দেন কিন্তু কোন উত্তর দেন নি। আবার তিনি বলেনঃ “হে উবাই (রাঃ)!' তিনি বলেনঃ ‘আস্সালামু আলাইকা।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘ওয়াআলাইকাস সালাম। তারপর বলেনঃ “হে উবাই (রাঃ)! আমি তোমাকে ডাক দিলে উত্তর দাওনি কেন?' তিনি বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি নামাযে ছিলাম।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন উপরোক্ত আয়াতটিই পাঠ করে বলেনঃ তুমি কি এই আয়াতটি শুননি? তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হাঁ (আমি শুনেছি) এরূপ কাজ আর আমার দ্বারা হবে না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ তুমি কি চাও যে, তোমাকে আমি এমন একটি সূরার কথা বলে দেই যার মত কোন সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল এবং কুরআনের মধ্যেই নেই? তিনি বলেনঃ হ্যা অবশ্যই বলুন।' তিনি বলেনঃ এখান থেকে যাবার পূর্বেই আমি তোমাকে তা বলে দেবো।' অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার হাত ধরে চলতে চলতে অন্য কথা বলতে থাকেন, আর আমি ধীর গতিতে চলতে থাকি। এই ভয়ে যে না জানি কথা থেকে যায় আর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাড়ীতে পৌছে যান। অবশেষে দরজার নিকট পৌছে আমি তাঁকে তাঁর অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেই।' তিনি বলেনঃ নামাযে কি পড়’ আমি উম্মুল কুরা’ পড়ে শুনিয়ে দেই।' তিনি বলেনঃ “সেই আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, এরূপ কোন সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল, জবুর এবং কুরআনের মধ্যে নেই। এটাই হলো ‘সাবআ মাসানী'। জামেউত তিরমিযীর মধ্যে আরও একটু বেশী আছে। তা হলো এই যে, এটাই বড় কুরআন যা আমাকে দান করা হয়েছে। এই হাদীসটি সংজ্ঞা ও পরিভাষা অনুযায়ী হাসান ও সহীহ। হযরত আনাস (রাঃ) হতেও এ অধ্যায়ে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। মুসনাদ-ই-আহমাদেও এইভাবে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) একে পরিভাষার প্রেক্ষিতে হাসান গারীব বলে থাকেন। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবদুল্লাহ বিন জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করি। সে সময় সবেমাত্র তিনি সৌচ ক্রিয়া সম্পাদন করেছেন। আমি তিনবার সালাম দেই কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না। তিনি তো বাড়ীর মধ্যেই চলে গেলেন, আমি দুঃখিত, ও মর্মাহত অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করি। অল্পক্ষণ পরেই পবিত্র হয়ে তিনি আগমন করেন এবং তিনবার সালামের জওয়াব দেন। অতঃপর বলেন, “হে আবদুল্লাহ বিন জাবির (রাঃ)! জেনে রেখো, সম্পূর্ণ কুরআনের মধ্যে সর্বোত্তম সূরা হলো اَلۡحَمۡدُ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِيۡنَ এই সূরাটি। এর ইসনাদ খুব চমক্কার। এর বর্ণনাকারী ইবনে আকীলের হাদীস বড় বড় ইমামগণ বর্ণনা করে থাকেন। এই আবদুল্লাহ বিন জাবির বলতে আবদী সাহাবীকে (রাঃ) বুঝানো হয়েছে। ইবনুল জাওযীর কথা এটাই। আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। হাফিয ইবনে আসাকীরের (রঃ) অভিমত এই যে, ইনি হলেন আবদুল্লাহ বিন জাবির আনসারী বিয়াযী (রাঃ)।
কুরআনের আয়াত ও সূরাসমূহ এবং ওগুলোর পারস্পরিক মর্যাদা
এই হাদীস এবং এ ধরনের অন্যান্য হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণ বের করে ইবনে রাহ্ইয়াহ, আবু বকর বিন আরবী, ইবনুল হাযার (রঃ) প্রমুখ অধিকাংশ আলেমগণ বলেছেন যে, কোন আয়াত এবং কোন সূরা অপর কোন আয়াত ও সূরার চেয়ে বেশী মর্যাদার অধিকারী। আবার অন্য একদলের ধারণা এই যে, আল্লাহর কালাম সবই সমান। একের উপর অন্যের প্রাধান্য দিলে যে অসুবিধার সৃষ্টি হবে তা হলো অন্য আয়াত ও সূরাগুলি কম মর্যাদা সম্পন্ন রূপে পরিগণিত ও প্রতিপন্ন হবে। অথচ আল্লাহপাকের সমস্ত কালামই সমমর্যাদাপূর্ণ। কুরতুবী এটাই নকল করেছেন আশআরী, আবু বকর বাকিল্লানী, আবু হাতিম ইবনে হাব্বান কূসতী, আবু হাব্বান এবং ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া হতে। ইমাম মালিক (রঃ) হতেও এই মর্মের অন্য একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
সূরা-ই-ফাতিহার মর্যাদার ব্যাপারে উপরোল্লিখিত হাদীসসমূহ ছাড়াও আরও হাদীস রয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফের ফাযায়িলুল কুরআন অধ্যায়ে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “একবার আমরা সফরে ছিলাম। এক স্থানে আমরা অবতরণ করি। হঠাৎ একটি দাসী এসে বললোঃ “এ জায়গার গোত্রের নেতাকে সাপে কেটেছে। আমাদের লোকেরা এখন সবাই অনুপস্থিত। ঝাড় ফুক দিতে পারে এমন কেউ আপনাদের মধ্যে আছে কি? আমাদের মধ্য হতে একটি লোক তার সাথে গেল। সে যে ঝাড় ফুকও জানতো তা আমরা জানতাম না। তথায় গিয়ে সে কিছু ঝাড় ফুক করলো। আল্লাহর অপার মহিমায় তৎক্ষণাৎ সে সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করলো। অনন্তর সে ৩০টি ছাগী দিল এবং আমাদের আতিথেয়তায় অনেক দুধও পাঠিয়ে দিল। সে ফিরে আসলে আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ “তোমার কি এ বিদ্যা জানা ছিল?' সে বললোঃ 'আমিতো শুধু সূরা-ই-ফাতিহা পড়ে ফুক দিয়েছি। আমরা বললামঃ “তাহলে এ প্রাপ্ত মাল এখনও স্পর্শ করো না। প্রথমে ক্লাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করো।' মদীনায় আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে এ ঘটনা আনুপূর্বিক বর্ণনা করলাম। তিনি বললেনঃ “এটা যে ফুক দেয়ার সূরা তা সে কি করে জানলো? এ মাল ভাগ করো। আমার জন্যেও একভাগ রেখো।' সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই আবি দাউদেও এ হাদীসটি রয়েছে। সহীহ মুসলিমের কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, ফুক দাতা হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) ছিলেন।
সহীহ মুসলিম ও সুনান-ই নাসাঈর মধ্যে হাদীস আছে যে, একদা হযরত জিব্রাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকটে বসেছিলেন, এমন সময়ে উপর হতে এক বিকট শব্দ আসলো। হযরত জিব্রাঈল (আঃ) উপরের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ আজ আকাশের ঐ দরজাটি খুলে গেছে যা ইতিপূর্বে কখনও খুলেনি। অতঃপর সেখান হতে একজন ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বললেন, আপনি খুশি হোন! এমন দুটি নূর আপনাকে দেয়া হলো যা ইতিপূর্বে কাউকেও দেয়া হয়নি। তা হলো সূরা-ই-ফাতিহা ও সূরা-ই- বাকারার শেষ আয়াতগুলো। ওর এক একটি অক্ষরের উপর নূর রয়েছে। এটা সুনান-ই-নাসাঈর শব্দ। সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নামাযে উম্মুল কুরআন পড়লো না তার নামায অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ পূর্ণ নয়। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আমরা যদি ইমামের পিছনে থাকি তা হলে? তিনি বললেনঃ “তাহলেও চুপে চুপে পড়ে নিও। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছি, তিনি বলতেন যে, আল্লাহ ঘোষণা করেনঃ “আমি নামাযকে আমার এবং আমার বান্দার মধ্যে অর্ধ-অর্ধ করে ভাগ করেছি এবং আমার বান্দা আমার কাছে যা চায়। তা আমি তাকে দিয়ে থাকি। যখন বান্দা বলে, اَلۡحَمۡدُ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِيۡنَ তখন আল্লাহ বলেনঃ حَمِدَنِىْ عَبْدِىْ অর্থাৎ আমার বান্দা আমার প্রশংসা করলো’ বান্দা যখন বলে, الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ তখন আল্লাহ বলেনঃ اَثْنٰى عَلَىَّ عَبْدِىْ অর্থাৎ বান্দা আমার গুণাগুণ বর্ণনা করলো। বান্দা যখন বলে, مٰلِكِ یَوْمِ الدِّیْنِ তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ مَجَّدَنِيْ عَبْدِيْ অর্থাৎ আমার বান্দা আমার মাহাত্ম্য বর্ণনা করলো।' কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেন فَرَّضَ اِلَىَّ عَبْدِيْ অর্থাৎ ‘বান্দা আমার উপর (সবকিছু) সর্মপণ করলো। যখন বান্দা বলে اِیَّاكَ نَعْبُدُ وَ اِیَّاكَ نَسْتَعِیْنُ তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা আমার ও আমার বান্দার মধ্যেকার কথা এবং আমার বান্দা আমার নিকট যা চাইবে আমি তাকে তাই দেবো' অতঃপর বান্দা শেষ পর্যন্ত পড়ে। তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এসব আমার বান্দার জন্যে এবং সে যা কিছু চাইলো তা সবই তার জন্য।' সুনান-ই নাসাঈর মধ্যে এই বর্ণনাটি আছে। কোন কোন বর্ণনার শব্দগুলির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এই হাদীসটিকে পরিভাষা অনুযায়ী হাসান বলেছেন। আবু জারাআ' একে সঠিক বলেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যেও এ হাদীসটি লম্বা ও চওড়াভাবে রয়েছে। ওর বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত উবাই বিন কা'ব (রাঃ)। ইবনে জারীরের একটি বর্ণনায় এ হাদীসটির মধ্যে এই শব্দগুলিও রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ‘এটা আমার জন্য যা অবশিষ্ট রয়েছে তা আমার বান্দার জন্য।' অবশ্য এ হাদীসটি এর উসূল বা মূলনীতির পরিভাষা অনুসারে গারীব বা দুর্বল।
আলোচ্য হাদীসের উপকার সমূহ, তৎসম্পর্কিত আলোচনা ও ফাতিহার অন্যান্য বৈশিষ্ট্য।
এখন এই হাদীসের উপকারিতা ও লাভালাভ লক্ষ্যণীয় বিষয়। প্রথমতঃ এই হাদীসের মধ্যে صَلٰوةٌ অর্থাৎ নামাযের সংযোজন রয়েছে এবং তার তাৎপর্যও ভাবার্থ হচ্ছে কিরআত। যেমন কুরআনের মধ্যে অন্যান্য জায়গায় রয়েছেঃ وَلَا تَجْهَرْ بِصَلَاتِكَ وَلَا تُخَافِتْ بِهَا وَابْتَغِ بَيْنَ ذٰلِكَ سَبِيْلًا অর্থাৎ স্বীয় নামায (কিরআত) কে খুব উচ্চৈঃস্বরে পড়ো না আর খুব নিম্ন স্বরেও না, বরং মধ্যম স্বরে পড়।' (১৭:১১০) এর তাফসীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে প্রকাশ্যভাবে বর্ণিত আছে যে, এখানে صَلٰوةٌ এর অর্থ হলো কিরাআত বা কুরআন পঠন। এভাবে উপরোক্ত হাদীসে কিরাআতকে সালাত বলা হয়েছে। এতে নামাযের মধ্যে কিরাআতের যে গুরুত্ব রয়েছে তা বিলক্ষণ জানা যাচ্ছে। আরও প্রকাশ থাকে যে, কিরআত নামাযের একটি মস্তবড় স্তম্ভ (এ জন্যেই এককভাবে ইবাদতের নাম নিয়ে ওর একটি অংশ অর্থাৎ কিরা'আতকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। অপরপক্ষে এমনও হয়েছে যে, এককভাবে কিরাআতের নাম নিয়ে তার অর্থ নামায নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলার কথাঃ وَ قُرْاٰنَ الْفَجْرِؕأِنَّ قُرْاٰنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُوْدًا
অর্থাৎ ‘ফজরের কুরআনের সময় ফেরেশতাকে উপস্থিত করা হয়।' (১৭:৭৮) এখানে কুরআনের ভাবার্থ হলো নামায। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে রয়েছে যে, ফজরের নামাযের সময় রাত্রি ও দিনের ফেরেশতাগণ একত্রিত হন। এই আয়াত ও হাদীসসমূহ দ্বারা বিলক্ষণ জানা গেল যে, নামাযে কিরাআত পাঠ খুবই জরুরী এবং আলেমগণও এ বিষয়ে একমত। দ্বিতীয়তঃ নামাযে সূরা-ই ফাতিহা পড়াই জরুরী কি না এবং কুরআনের মধ্য হতে যা কিছু পড়ে নেওয়াই যথেষ্ট কি না এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর সহচরগণ বলেন যে, নির্ধারিতভাবে যে সূরা ফাতিহাই পড়তে হবে এটা জরুরী নয়। বরং কুরআনের মধ্য হতে যা কিছু পড়ে নেবে তাই যথেষ্ট। তাঁর দলীল হলো فَاقْرَءُوْا مَا تَیَسَّرَ مِنَ الْقُرْاٰنِؕ (৭৩:২০) এই আয়াতটি। অর্থাৎ কুরআনের মধ্য হতে যা কিছু সহজ হয় তাই পড়ে নাও।' সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে যে হাদীস আছে তাতে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাড়াতাড়ি নামায আদায়কারী এক ব্যক্তিকে বললেনঃ যখন তুমি নামাযের জন্যে দাঁড়াবে তখন তাকবীর বলবে এবং কুরআনের মধ্য হতে যা তোমার নিকট সহজ বোধ হবে তাই পড়বে।' তারা বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) লোকটিকে সূরা ফাতিহা পড়ার কথা নির্দিষ্টভাবে বলেন না এবং যে কোন কিছু পড়াকেই যথেষ্ট বলে মনে করলেন। দ্বিতীয় মত এই যে, সূরা ফাতিহা পড়াই জরুরী এবং অপরিহার্য এবং তা পড়া ছাড়া নামায হয় না। অন্যান্য সমস্ত ইমামের এটাই মত। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং তাঁদের ছাত্র ও জমহুর উলামা সবারই এটাই অভিমত। এই হাদীসটি তাঁদের দলীল যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি যে কোন নামায পড়লো এবং তাতে উম্মুল কুরআন পাঠ করলো না, ঐ নামায অসম্পূর্ণ, অসম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ-পূর্ণ নয়। এরকমই ঐসব বুযুর্গ ব্যক্তিদের এটাও দলীল যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সূরা-ই ফাতিহা পড়ে না তার নামায হয় না।' সহীহ ইবনে খুযাইমাহ্ ও সহীহ ইবনে হিব্বানের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ নামায হয় না যার মধ্যে উম্মুল কুরআন পড়া না হয়। এ ছাড়া আরও বহু হাদীস রয়েছে। এখানে আমাদের বিতর্কমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনার তেমন প্রয়োজন নেই। কারণ এ আলোচনা অতি ব্যাপক ও দীর্ঘ। আমরা তো সংক্ষিপ্তভাবে শুধু উপরোক্ত মনীষীর দলীলসমূহ এখানে বর্ণনা করে। দিলাম। এখন এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, ইমাম শাফিঈ (রঃ) প্রভৃতি মহান আলেমদের একটি দলের মাযহাব এটাই যে, প্রতি রাকাআতে সূরা-ই-ফাতিহা পড়া ওয়াজিব এবং অন্যান্য লোকের মতে অধিকাংশ রাকআতে পড়া ওয়াজিব। হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং বসরার অধিকাংশ লোকেই বলেন যে, নামাযসমূহের মধ্যে কোন এক রাকাআতে সূরা ফাতিহা পড়ে নেয়া ওয়াজিব। কেননা হাদীসের মধ্যে সাধারণভাবে নামাযের উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) এবং তাঁর অনুসারী সুফিয়ান সাওরী (রঃ) ও আওযায়ী (রঃ) বলেন যে, ফাতিহাকেই নির্দিষ্টভাবে পড়ার কোন কথা নেই বরং অন্য কিছু পড়লেই যথেষ্ট হবে। কারণ পবিত্র কুরআনের মধ্যে مَاتَيَسَّرَ শব্দটি রয়েছে। আল্লাহ তাআলাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। কিন্তু এটা স্মরণ রাখা উচিত যে, সুনান-ই-ইবনে মাজায় রয়েছেঃ 'যে ব্যক্তি ফরয ইত্যাদি নামাযে সূরা-ই-ফাতিহা এবং অন্য সূরা পড়লো না তার নামায হলো না। তবে অবশ্যই এ হাদীসটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এসব কথার বিস্তারিত আলোচনার জন্যে শরীয়তের আহকামের বড় বড় কিতাব রয়েছে। আল্লাহ তা'আলাই এসব ব্যাপারে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ জ্ঞানের অধিকারী।
তৃতীয়তঃ মুকতাদীগণের উপর সূরা-ই-ফাতিহা পাঠ ওয়াজিব হওয়ার প্রশ্নে আলেমদের তিনটি অভিমত রয়েছে।
(১) সূরা ফাতিহা পাঠ ইমামের উপর যেমন ওয়াজিব, মুকতাদির উপরও তেমনই ওয়াজিব।
(২) মুকতাদির উপর কিরাআত একবারেই ওয়াজিব নয়। সূরা ফাতিহাও নয় এবং অন্য সূরাও নয়। তাদের দলীল-প্রমাণ মুসনাদ-ই-আহমাদের সেই হাদীসটি, যার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যার জন্যে ইমাম রয়েছে, ইমামের কিরাআতই তার কিরাআত। কিন্তু বর্ণনাটি হাদীসের পরিভাষায় একান্ত দুর্বল এবং স্বয়ং এটা হযরত জাবিরের (রাঃ) কথা দ্বারা বর্ণিত আছে। যদিও এই মারফু (যে হাদীসের সনদ রাসূলুল্লাহ (সঃ) পর্যন্ত পৌছেছে অর্থাৎ স্বয়ং তাঁর হাদীস বলে সাব্যস্ত হয়েছে তাকে মারফু হাদীস বলে) হাদীসটির অন্যান্য সনদও রয়েছে, কিন্তু কোন সনদই অভ্রান্ত ও সঠিক নয়। অবশ্য আল্লাহই এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জানেন।
(৩) যে নামাযে ইমাম আস্তে কিরাআত পড়েন তাতে তো মুকতাদির উপর কিরাআত পাঠ ওয়াজিব, কিন্তু যে নামাযে উচ্চৈঃস্বরে কিরআত পড়া হয় তাতে ওয়াজিব নয়। তাদের দলীল প্রমাণ হচ্ছে সহীহ মুসলিমের হাদীসটি। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অনুসরণ করার জন্যে ইমাম নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁর তাকবীরের পরে তাকবীর বল এবং যখন তিনি পাঠ করেন তখন তোমরা চুপ থাক।' সুনানের মধ্যেও এই হাদীসটি রয়েছে। ইমাম মুসলিম (রঃ) এর বিশুদ্ধতা স্বীকার করেছেন। ইমাম শাফিঈরও (রঃ) প্রথম মত এটাই এবং ইমাম আহমদ (রঃ) হতেও এরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে।
এই সব মাসয়ালা এখানে বর্ণনা করার আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, সূরা-ই ফাতিহার সঙ্গে শরীয়তের নির্দেশাবলীর যতটা সম্পর্ক রয়েছে অন্য কোন সূরার সঙ্গে ততটা সম্পর্ক নেই। মুসনাদ-ই-বাজ্জাজের মধ্যে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ 'যখন তোমরা বিছানায় শয়ন কর তখন যদি সূরা-ই-ফাতিহা এবং قُلْ هُوَ اللّٰهُ সূরা পড়ে নাও, তাহলে মৃত্যু ছাড়া প্রত্যেক জিনিস হতে নিরাপদে থাকবে।'
ইসতি‘আযাহ বা اَعُوْذُ بِاللّٰهِ ‘আউযুবিল্লাহ’-এর তাফসীর এবং তার আহকাম ও নির্দেশাবলী
পবিত্র কুরআনে রয়েছেঃ خُذِ الْعَفْوَ وَ اْمُرْ بِالْعُرْفِ وَ اَعْرِضْ عَنِ الْجٰهِلِیْنَ . وَ اِمَّا یَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّیْطٰنِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللّٰهِؕ অর্থাৎ ক্ষমা করে দেয়ার অভ্যাস কর, ভাল কাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খদের দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নাও, যদি শয়তানের কোন কুমন্ত্রণা এসে যায় তবে সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।' (৭:১৯৯-২০০) অন্য এক জায়গায় বলেছেনঃ اِدْفَعْ بِالَّتِیْ هِیَ اَحْسَنُ السَّیِّئَةَؕ-نَحْنُ اَعْلَمُ بِمَا یَصِفُوْنَ . وَ قُلْ رَّبِّ اَعُوْذُ بِكَ مِنْ هَمَزٰتِ الشَّیٰطِیْنِ . وَ اَعُوْذُ بِكَ رَبِّ اَنْ یَّحْضُرُوْنِ অর্থাৎ ‘অমঙ্গলকে মঙ্গলের দ্বারা প্রতিহত কর, তারা যা কিছু বর্ণনা করছে তা আমি খুব ভালভাবে জানি। বলতে থাক-হে আল্লাহ! শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং তাদের উপস্থিতি হতে আমরা আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।' (২৩:৯৬-৯৮)
অন্য এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ اِدْفَعْ بِالَّتِیْ هِیَ اَحْسَنُ فَاِذَا الَّذِیْ بَیْنَكَ وَ بَیْنَهٗ عَدَاوَةٌ كَاَنَّهٗ وَلِیٌّ حَمِیْمٌ অর্থাৎ ‘অমঙ্গলকে মঙ্গল দ্বারা পতিহত কর, তাহলে তোমার এবং অন্যের মধ্যে শক্রতা রয়েছে তা এমন হবে যে, যেন সে অকৃত্রিম সাহায্যকারী বন্ধু'। (৪১:৩৪) এ কাজটি ধৈর্যশীল ও ভাগ্যবান ব্যক্তিদের জন্যে। অর্থাৎ যখন কুমন্ত্রণা এসে পড়ে তখন সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।
এই মর্মে এই তিনটিই আয়াত আছে এবং এই অর্থের অন্য কোন আয়াত নেই। আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতসমূহের মাধ্যমে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, মানুষের শক্রতার সবচাইতে ভাল ঔষুধ হলো প্রতিদানে তাদের সঙ্গে সৎ ব্যবহার করা। এরূপ করলে তারা তখন শত্রুতা করা থেকেই বিরত থাকবেন না, বরং অকৃত্রিম বন্ধুতে পরিণত হবে। আর শয়তানদের শত্রুতা হতে নিরাপত্তার জন্যে আল্লাহ তারই নিকট আশ্রয় চাইতে বলছেন। কেননা এই শয়তানরূপী অপবিত্র শক্রদেরকে উত্তম ব্যবহারের দ্বারাও আয়ত্তে আনা কখনো সম্ভব নয়। কারণ সে। মানুষের বিনাশ ও ধ্বংসের মধ্যে আমোদ পায় এবং তার পুরাতন শক্রতা হযরত হাওয়া ও হযরত আদম (আঃ)-এর সময় হতেই অব্যাহত রয়েছে। কুরআন ঘোষণা করছেঃ “হে আদমের সন্তানেরা! তোমাদেরকে যেন এই শয়তান পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত না করে ফেলে, যেমন তোমাদের বাপ-মাকে পথভ্রষ্ট করে। চির সুখের জান্নাত হতে বের করে দিয়েছিল। অন্য স্থানে বলা হচ্ছেঃ ‘শয়তান তোমাদের শত্রু, তাকে শত্রুই মনে কর। তার দলের তো এটাই কামনা যে তোমরা দোযখবাসী হয়ে যাও। কি! আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানের সঙ্গে এবং তার সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছো? তারা তো তোমাদের পরম শত্রু। জেনে রেখো যে, অত্যাচারীদের জন্যে জঘন্য প্রতিদান রয়েছে। এতো সেই শয়তান যে আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)কে বলেছিলঃ “আমি তোমার একান্ত শুভাকাংখী। তা হলে চিন্তার বিষয় যে, আমাদের সঙ্গে তার চালচলন কি হতে পারে? আমাদের জন্যেই তো সে শপথ করে বলেছিলঃ মহা সম্মানিত আল্লাহর শপথ! আমি তাদেরকে বিপথে নিয়ে যাবো। তবে হ্যা, যারা তার খাটি বান্দা তারা নিরাপদে থাকবে। এ জন্যে মহান আল্লাহ বলেনঃ فَاِذَا قَرَاْتَ الْقُرْاٰنَ فَاسْتَعِذْ بِاللّٰهِ مِنَ الشَّیْطٰنِ الرَّجِیْمِ
অর্থাৎ তোমরা কুরআন পাঠের সময় বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর।' (১৬:৯৮) ঈমানদারগণ ও প্রভুর উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের উপরে তার কোন ক্ষমতাই নেই। আর ক্ষমতা তো শুধু তাদের উপরই রয়েছে যারা তার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে এবং আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে শিরক করে থাকে।
কারীদের একটি দল ও অন্যেরা বলে থাকেন যে, কুরআন পাঠের পর اَعُوْذُ بِاللّٰهِ পড়া উচিত। এতে দু'টি উপকার রয়েছে। এক তো হলোঃ কুরআনের বর্ণনারীতির উপর আমল এবং দ্বিতীয় হলোঃ ইবাদত শেষে অহংকার দমন। আবু হাতিম সিজিসতানী এবং ইবনে ফাল্ফা হামযার এই নীতিই নকল করেছেন। যেমন আরুল কাসিম ইউসুফ বিন আলী বিন জানাদাহ (রঃ) স্বীয় কিতাব “আল ইবাদাতুল কামিল’-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। কিন্তু হাদীসের পরিভাষায় এর ইসনাদ গারীব। ইমাম যারী (রঃ) স্বীয় তাফসীরের মধ্যে এটা নকল করেছেন এবং বলেছেন যে, ইবরাহীম নাখয়ী (রঃ) ও দাউদ যাহেরীরও (রঃ) এই অভিমত। কুরতুবী (রঃ) ইমাম মালিকের (রঃ) মাযহাবও এটাই বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ইবনুল আরাবী একে গারীব বলে থাকেন। একটি মাযহাব এরূপ আছে যে, প্রথমে ও শেষে এই দু’বার اَعُوْذُ بِاللّٰهِ পড়া উচিত। তাহলে দুটি দলীলই একত্রিত হয়ে যাবে। জমহুর উলামার প্রসিদ্ধ মাযহাব এই যে, কুরআন পাঠের পূর্বে اَعُوْذُ بِاللّٰهِ পাঠ করা উচিত, তাহলে কুমন্ত্রণা হতে রক্ষা পাওয়া যাবে। সুতরাং ঐ বুযুর্গদের নিকট আয়াতের অর্থ হবেঃ “যখন তুমি পড়বে অর্থাৎ তুমি পড়ার ইচ্ছা করবে। যেমন নিম্নের আয়াতটিঃ اِذَا قُمْتُمْ اِلَى الصَّلٰوةِ
অর্থাৎ যখন তুমি নামায পড়ার জন্যে দাঁড়াও" (তবে ওযু করে নাও)-এর অর্থ হলোঃ যখন তুমি নামাযের জন্য দাঁড়াবার ইচ্ছা কর।' হাদীসগুলোর ধারা অনুসারে এই অর্থটিই সঠিক বলে মনে হয়। মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে আছে যে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মামাযের জন্য দাঁড়াতেন তখন اَللّٰهُ اَكْبَرُ বলে নামায আরম্ভ করতেন অতঃপর, سُبْحَانَكَ اللّٰهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالٰى جَدُّكَ وَلَااِلٰهَ غَيْرُكَ তিনবার পড়ে لَآ اِلٰهَ اِلَّا اللّهُ ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ পড়তেন। তারপর পড়তেনঃ اَعُوْذُ بِاللهِ السَّمِيْعِ الْعَلِيْمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ مِنْ هَمْزِهٖ وَنَفْخِهٖ وَنَفْثِهٖ সুনান-ই-আরবার মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এই অধ্যায়ে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ-হাদীস এটাই। هَمَزٌ শব্দের অর্থ হলো গলা টিপে ধরা, نَفَخٌ শব্দের অর্থ হলো অহংকার এবং نَفَثٌ শব্দের অর্থ হলো কবিতা পাঠ। ইবনে মাজা (রঃ) স্বীয় সুনানে এই অর্থ বর্ণনা করেছেন। তাতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে প্রবেশ করেই اَللّٰهُ اَكْبَرُ كَبِيْرًا তিনবার وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ كَثِيْرًا তিনবার এবং তিনবার سُبْحَانَ اللَّهِ بُكْرَةً وَّاَصِيْلًا পাঠ করতেন।অতঃপর اَللّٰهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُبِكَ مِنَ الشَّيْطَانِ مِنْ هَمْزِهٖ وَنَفْخِهٖ وَنَفْثِهٖ পড়তেন।
সুনান-ই-ইবনে মাজাতেও অন্য সনদে এই হাদীসটি সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে। মুসনাদ-ই- আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তিনবার اَللّهُ اَكْبَرُ তাকবীর বলতেন। অতঃপর سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهٖ তিনবার বলতেন। অতঃপর اَعُوْذُ بِاللهِ শেষ পর্যন্ত পড়তেন। মুসনাদে-ই-আবি ইয়ালার মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সামনে দুটি লোকের ঝগড়া বেধে যায়। ক্রোধে একজনের নাসারন্ধ্র ফুলে উঠে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যদি লোকটি اَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ পড়ে নেয় তবে তার ক্রোধ এখনই ঠাণ্ডা ও স্তিমিত হয়ে যাবে।' ইমাম নাসাঈ (রঃ) স্বীয় কিতাব اَلْيَوْمُ وَاللَّيْلَةُ-এর মধ্যেও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামেউত তিরমিযীর মধ্যেও হাদীসটি রয়েছে; একটি বর্ণনায় আরও একটু বেশী আছে, তা এই যে, হযরত মুআয (রাঃ) লোকটাকে তা পড়তে বলেন। কিন্তু সে তা পড়লো না এবং ক্রোধ উত্তরোত্তর বেড়েই চললো। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এই বৃদ্ধি যুক্ত বর্ণনাটি মুরসাল। কেননা আবদুর রহমান বিন আবু লাইলা, যিনি হযরত মুআ (রাঃ) হতে সেটি বর্ণনা করেছেন, হযরত মুআযের (রাঃ) সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হওয়াই সাব্যস্ত হয় না। কারণ তিনি বিশ বছর পূর্বে নশ্বর দুনিয়া হতে বিদায় নিয়েছিলেন। কিন্তু হতে পারে যে, হয়তো আবদুর রহমান হযরত উবাই বিন কাব (রাঃ) হতে ওটা শুনেছেন। তিনিও এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী এবং তিনি ওটাকে হযরত মুআয পর্যন্ত পৌছিয়ে দিয়েছেন। কেননা, এ ঘটনার সময় তো বহু সাহাবী (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনান-ই- আবি দাউদ এবং সুনা-ই-নাসাঈর মধ্যেও বিভিন্ন সনদে এবং বিভিন্ন শব্দে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। এ সম্পর্কে আরও হাদীস রয়েছে। এখানে সমস্ত কিছু বর্ণনা করলে আলোচনা খুব দীর্ঘায়িত হয়ে যাবে। এ সবের বর্ণনার জন্য যিকর, ওযীফা এবং আমলের বহু কিতাব রয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাই খুব বেশী জানেন।
একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত জিব্রাঈল (আঃ) সর্বপ্রথম যখন প্রত্যাদেশ নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন তখন প্রথমে اَعُوْذُ بِاللهِ পড়ার নির্দেশ দেন। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, প্রথম দফায় হযরত জিব্রাঈল (আঃ) হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর নিকট ওয়াহী এনে বলেনঃ “আঊযু পড়ুন।' তিনি পাঠ اَسْتَعِيْذُ بِاللهِ السَّمِيْعِ الْعَلِيْمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ করেন। হযরত জিব্রাঈল (আঃ) পুনরায় বলেনঃ بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ পাঠ করুন। তারপরে বলেনঃ اِقْرَاْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِیْ خَلَقَ অর্থাৎ যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন আপনার সেই প্রভুর নামে পাঠ করুন।
হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন যে, সর্বপ্রথম সূরা-যা আল্লাহ তা'আলা হযরত জিব্রাঈলের (আঃ) মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ (রাঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেন তা এটাই। কিন্তু হাদীসটি গারীব এবং এর সনদের মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে। শুধু জেনে রাখার জন্যেই এখানে এটা বর্ণনা করলাম। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন।
‘মাসআলাহ’ বা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য বিষয়ঃ
জামহুর উলামার মতে ‘ইসতি‘আযাহু’ বা ‘আঊযুবিল্লাহ' পড়া মুসতাহাব, ওয়াজিব নয়। সুতরাং তা না পড়লে পাপ হবে না। আ’তা বিন আবি রিবাহের (রঃ) অভিমত এই যে, কুরআন পাঠের সময় আঊযু পড়া ওয়াজিব-নামাযের মধ্যেই হোক বা নামাযের বাইরেই হোক। ইমাম রাযী (রঃ) এই কথাটি নকল করেছেন। ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, জীবনে একবার মাত্র পড়লেই কর্তব্য পালন হয়ে যাবে। হযরত আতার (রঃ) কথার দলীল প্রমাণ হলো আয়াতের প্রকাশ্য শব্দগুলো। কেননা, এতে فَاسْتَعِذْ শব্দটি ‘আমর’ বা নির্দেশ সূচক ক্রিয়াপদ। আর আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী আমর’ অবশ্যকরণীয় কার্যের জন্যেই ব্যবহৃত হয়। ঠিক দ্রুপ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সদা সর্বদা এর উপর আমলও তা অবশ্যকরণীয় হওয়ার দলীল। এর দ্বারা শয়তানের দুষ্টুমি ও দুস্কৃতি দূর হয় এবং তা দূর হওয়াও একরূপ ওয়াজিব। আর যা দ্বারা ওয়াজিব পূর্ণ হয় সেটাও ওয়াজিব হয়ে দাঁড়ায়। আশ্রয় প্রার্থনা অধিক সতর্কতা বিশিষ্ট হয়ে থাকে এবং অবশ্যকরণীয় কাজের এটাও একটা পন্থা বটে। কোন কোন আলেমের কথা এই যে, “আউযু' পাঠ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপরই ওয়াজিব ছিল, তার উম্মতের উপর ওয়াজিব নয়। ইমাম মালিক (রঃ) হতে এটাও বর্ণনা করা হয় যে, ফরয নামাযের নয় বরং রামাযান শরীফের প্রথম রাত্রির নামাযে ‘আউযু' পড়া উচিত।
জিজ্ঞাস্যঃ
ইমাম শাফিঈ (রঃ) স্বীয় ইমলা’র মধ্যে লিখেছেন যে, আউযুবিল্লাহ জোরে সশব্দে পড়তে হবে কিন্তু আস্তে পড়লেও তেমন কোন দোষ নেই। ইমাম শাফিঈ (রঃ) স্বীয় কিতাবুল উম্ম’ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থে লিখেছেন যে, জোরে ও আস্তে উভয়ভাবেই পড়ার অধিকার রয়েছে। কারণ হযরত ইবনে উমর (রঃ) হতে ধীরে পড়ার এবং হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে উচ্চৈঃস্বরে পড়ার কথা সাব্যস্ত আছে। প্রথম রাকআত ছাড়া অন্যান্য রাকআতে আউযুবিল্লাহ পড়ার ব্যাপারে ইমাম শাফিঈর (রঃ) দু’টি মত রয়েছে। প্রথমটি মুসতাহাব হওয়ার এবং দ্বিতীয়টি মুসতাহাব না হওয়ার। প্রাধান্য দ্বিতীয় মতের উপরই রয়েছে। আল্লাহ তা'আলাই সঠিক ও সুষ্ঠু জ্ঞানের অধিকারী।
ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম আবু হানীফার (রঃ) নিকট শুধু اَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ পড়াই যথেষ্ট। কিন্তু কেউ কেউ বলেন যে, اَعُوْذُ بِاللهِ السَّمِيْعِ الْعَلِيْمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ পড়তে হবে। আবার কেউ বলেনঃ اَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ اِنَّ اللّٰهَ هُوَ السَّمِيْعِ الْعَلِيْمِ পাঠ করতে হবে। সাওরী (রঃ) এবং আওযায়ীর (রঃ) এটাই মাযহাব। কেউ কেউ আবার বলেন যে, اَسْتَعِيْذُ بِاللهِ السَّمِيْعِ الْعَلِيْمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ পড়তে হবে। তা হলে আয়াতের সমস্ত শব্দের উপর আমল হয়ে যাবে এবং তার সাথে হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) হাদীসের উপর আমল করা হবে। একথা পূর্বেও বলা হয়েছে। কিন্তু এ প্রসঙ্গে যেসব বিশুদ্ধ হাদীস ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে ঐগুলোই অনুসরণের পক্ষে সর্বোত্তম। আল্লাহ তাআলাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন।
ইমাম আবু হানিফা (রঃ) ও ইমাম মুহাম্মাদের (রঃ) মতে নামাযের মধ্যে আউযুবিল্লাহ পড়া হয় তিলাওয়াতের জন্য। আর ইমাম আবু ইউসুফের (রঃ) মতে নামাযের জন্য পাঠ করা হয়। সুতরাং মুকতাদীরও পড়ে নেয়া উচিত যদিও সে কিরআত পড়ে না। ঈদের নামাযেও প্রথম তাকবীরের পর পড়ে নেয়া দরকার। জমহুরের মাযহাব এই যে, ঈদের নামাযে সমস্ত তাকবীর বলার পর আউযুবিল্লাহ পড়তে হবে, তারপর কিরআত পড়তে হবে। আউযুবিল্লাহের মধ্যে রয়েছে বিস্ময়কর উপকার ও মাহাত্ম্য। আজে বাজে কথা বলার ফলে মুখে যে অপবিত্রতা আসে তা বিদূরিত হয়। ঠিক দ্রুপ এর দ্বারা মহান আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা হয় এবং তার ব্যাপক ও একচ্ছত্র ক্ষমতার কথা স্বীকার করা হয়। আর আধ্যাত্মিক প্রকাশ্য শত্রুর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্বীয় দুর্বলতা ও অপারগতার কথা স্বীকার করে নেয়া হয়। কেননা মানুষ শক্রর মুকাবিলা করা যায়। অনুগ্রহ ও সদ্ব্যবহার দ্বারা তার শত্রুতা দূর করা যায়। যেমন পবিত্র কুরআনের ঐ আয়াতগুলির মধ্যে রয়েছে যেগুলি ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেনঃ اِنَّ عِبَادِیْ لَیْسَ لَكَ عَلَیْهِمْ سُلْطٰنٌؕ وَ كَفٰى بِرَبِّكَ وَكِیْلًا
অর্থাৎ “নিশ্চয় আমার বিশিষ্ট বান্দাদের উপর তোমার কর্তৃত্ব চলবে না, আল্লাহর প্রতিনিধিত্বই যথেষ্ট।' (১৭:৬৫) আল্লাহ পাক ইসলামের শত্রুদের মুকাবিলায় ফেরেশতা পাঠিয়েছেন এবং তাদের গর্ব খর্ব করেছেন। এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, যে মুসলিম কাফিরের হাতে মৃত্যুবরণ করেন, তিনি শহীদ হন। যে সেই গোপনীয় শত্রু শয়তানের হাতে মারা পড়ে সে আল্লাহর দরবার থেকে হবে বহিষ্কৃত, বিতাড়িত। মুসলমানের উপর কাফিরেরা জয়যুক্ত হলে মুসলমান প্রতিদান পেয়ে থাকেন। কিন্তু যার উপর শয়তান জয়যুক্ত হয় সে ধ্বংস হয়ে যায়। শয়তান মানুষকে দেখতে পায় কিন্তু মানুষ শয়তানকে দেখতে পায় বলে কুরআন কারীমের শিক্ষা হলোঃ “তোমরা তার অনিষ্ট হতে তার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর যিনি তাকে (শয়তানকে) দেখতে পান কিন্তু সে তাঁকে দেখতে পায় না।
আউযুবিল্লাহ পড়া হলো আল্লাহ তা'আলার নিকট বিনীত হয়ে প্রার্থনা করা এবং প্রত্যেক অনিষ্টকারীর অনিষ্ট হতে তার নিকট আশ্রয় চাওয়া। عَيَاذُه-এর অর্থ হলো অনিষ্ট দূর করা, আর لَيَاذُه-এর অর্থ হলো মঙ্গল ও কল্যাণ লাভ করা। এর প্রমাণ হিসেবে মুতানাব্বির এই কবিতাটি দ্রষ্টব্যঃ يَامَنْ اَلُوْذُ بِهٖ فِيْمَا اَوُمِّلُهٗ ـ وَمَنْ اَعُوْذُ بِهٖ مِمَّا اُحَاذِرُهٗ ـ لَايُجْبَرُ النَّاسُ عَظْمًا اَنْتَ كَاسِرُهٗ ـ وَلَايَهِيْضُوْنَ عَظْمًا اَنْتَجَابِرُهٗ অর্থাৎ ‘হে সেই পরিত্র সত্তা, যে সত্তার সাথে সাথে আমার সমুদয় আশা ভরসা বিজড়িত হয়েছে, এবং হে সেই পালনকর্তা যাঁর নিকট আমি সমস্ত অমঙ্গল থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। যা তিনি ভেঙ্গে দেন তা কেউ জোড়া দিতে পারে এবং যা তিনি জোড়া দেন তা কেউ ভাঙ্গতে পারে না। اَعُوْذُ-এর অর্থ হলো এই যে, আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি যেন বিতাড়িত শয়তান ইহজগতে ও পরজগতে আমার কোন ক্ষতি করতে না পারে। যে নির্দেশাবলী পালনের জন্যে আমি আদিষ্ট হয়েছি তা পালনে যেন আমি বিরত না হয়ে পড়ি। আবার যা করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে তা যেন আমি করে না ফেলি। এটা তো বলাই বহুল্য যে, শয়তানের অনিষ্ট হতে একমাত্র আল্লাহ পাক ছাড়া আর কেউ রক্ষা করতে পারে না। এ জন্যে বিশ্ব প্রভু আল্লাহ মানুষরূপী শয়তানের দুষ্কার্য ও অন্যায় হতে নিরাপত্তা লাভ করার যে পন্থা শেখালেন তা হলো তাদের সঙ্গে সদাচরণ। কিন্তু জ্বিন রূপী শয়তানের দুষ্টুমি ও দুষ্কৃতি হতে রক্ষা পাওয়ার যে উপায় তিনি বলে দিলেন তা হলো তার স্বরণে আশ্রয় প্রার্থনা। কেননা, না তাকে ঘুষ দেওয়া যায়, না তার সাথে সদ্ব্যবহারের ফলে সে দুষ্টুমি হতে বিরত হয়। তার অনিষ্ট হতে তো বাঁচাতে পারেন একমাত্র আল্লাহ রাব্দুল ইযত। প্রাথমিক তিনটি আয়াতে এ বিষয় আলোচিত হয়েছে। সূরা-ই আরাফে আছেঃ خُذِ الْعَفْوَ وَ اْمُرْ بِالْعُرْفِ وَ اَعْرِضْ عَنِ الْجٰهِلِیْنَ (৭:১৯৯)। সূরা-ই-হা-মীম সেজদায় আছেঃ وَ لَا تَسْتَوِی الْحَسَنَةُ وَ لَا السَّیِّئَةُؕ-اِدْفَعْ بِالَّتِیْ هِیَ اَحْسَنُ (৪১:৩৪) এবং সূরা-ই মুমেনূনে রয়েছেঃ اِدْفَعْ بِالَّتِیْ هِیَ اَحْسَنُ السَّیِّئَةَؕ-نَحْنُ اَعْلَمُ بِمَا یَصِفُوْنَ (২৩:৯৬)
এই তিনটি আয়াতের বিস্তারিত বর্ণনা ও অনুবাদ ইতিপূর্বেই করা হয়েছে। সুতরাং পুনরাবৃত্তির আর তেমন প্রয়োজন নেই।
شَيْطَان শয়তান -শব্দটির আভিধানিক বিশ্লেষণ
আরবী ভাষার অভিধানে شَيْطَان শব্দটি شَطَنٌ থেকে উদগত। এর আভিধানিক অর্থ হলো দূরত্ব। যেহেতু এই মারদুদ ও অভিশপ্ত শয়তান প্রকৃতগতভাবে মানব প্রকৃতি হতে দূরে রয়েছে, বরং নিজের দুষ্কৃতির কারণে প্রত্যেক মঙ্গল ও কল্যাণ হতে দূরে আছে, তাই তাকে শয়তান বলা হয়। একথাও বলা হয়েছে যে, এটা شَاطَ হতে গঠিত হয়েছে। কেননা সে আগুন হতে সৃষ্টি হয়েছে এবং شَاطَ এর অর্থ এটাই। কেউ কেউ বলেন যে, অর্থের দিক দিয়ে দুটোই ঠিক। কিন্তু প্রথমটিই বিশুদ্ধতর। আরব কবিদের কবিতার মধ্যে এর সত্যতা প্রমাণিত হয় সর্বোতভাবে। প্রসঙ্গক্রমে কবি উমাইয়া বিন আবিসসালাতের কবিতাটি এইঃ اَيُّمَا شَاطِنٌ عَصَاهٗ عَكَاهٗ ـ ثُمَّ يُلْقِىْ فِى السِّجْنِ وَالْاَغْلَالُ অনুরূপভাবে কবি নাবেগার কবিতার মধ্যেও এ শব্দটি شطن হতে গঠিত হয়েছে এবং দূর হওয়ার অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। কবি নাবেগার কবিতাটি এইঃ نَاْتِ بِسُعَادِ عَنْكَ نَوٰى شُطُوْنٌ ـ فَبَاتِتْ وَالْفُوَادُ بِهَا رَهِيْنٌ সীবাওয়াইর উক্তি আছে যে, যখন কেউ শয়তানী কাজ করে তখন আরবেরা বলেঃ تَشَيْطَنَ فُلَانٌ কিন্তু تَشَيَّطَ فُلَانٌ বলে না। এ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এ শব্দটি شَاطَ হতে নয়, বরং شَطَنٌ হতেই নেয়া হয়েছে। এর সঠিক অর্থ হচ্ছে দূরত্ব। কোন জ্বিন, মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু দুষ্টুমি করলে তাকে শয়তান বলা হয়। কুরআন পাকে রয়েছেঃ وَ كَذٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِیٍّ عَدُوًّا شَیٰطِیْنَ الْاِنْسِ وَ الْجِنِّ یُوْحِیْ بَعْضُهُمْ اِلٰى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُوْرًاؕ
অর্থাৎ এভাবেই আমি মানব ও দানব শয়তানদেরকে প্রত্যেক নবীর শত্রু করেছি যারা একে অপরের নিকট প্রতারণামূলক বানানো কথা পৌছিয়ে থাকে। মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত আবু যর (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বলেনঃ “হে আবূ যর (রাঃ)! দানব ও মানব শয়তানগণ হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর। আমি বলি, মানুষের মধ্যেও কি শয়তান আছে? তিনি বলেনঃ হাঁ। সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু যর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ স্ত্রীলোক, গাধা এবং কালো কুকুর নামায ভেঙ্গে নষ্ট করে দেয়। তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! লাল, হলদে কুকুর হতে কালো কুকুরকে স্বতন্ত্র করার কারণ ছিল রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ কালো কুকুর শয়তান।
হযরত যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি তার পিতা হতে বর্ণনা করেনঃ হযরত উমার (রাঃ) একবার তকী ঘোড়ার উপরে আরোহণ করেন। ঘোড়াটির সগর্বে চলতে থাকে। হযরত উমার ঘোড়াটিকে মারপিটও করতে থাকেন। কিন্তু ওর সদর্প চাল আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি নেমে পড়েন এবং বলেনঃ তুমি তো আমার আরোহণের জন্যে কোন শয়তানকে ধরে এনেছ! আমার মনে অহংকারের ভাব এসে গেছে। সুতরাং আমি নেমে পড়াই ভাল মনে করলাম।' رَجِيْم শব্দটি - فَعِيْل এর ওজনে اِسْم مَفْعُوْل-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সে মারদুদ বা বিতাড়িত। অর্থাৎ প্রত্যেক মঙ্গল হতে সে দূরে আছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ وَ لَقَدْ زَیَّنَّا السَّمَآءَ الدُّنْیَا بِمَصَابِیْحَ وَ جَعَلْنٰهَا رُجُوْمًا لِّلشَّیٰطِیْنِ
অবশ্যই আমি দুনিয়ার আকাশকে তারকারাজি দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং ওগুলোকে শয়তানদের তাড়ন করেছি। তারা বড় বড় ফেরেশতাদের কথা শুনতে পায় না এবং তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য চতুর্দিক হতে মারা হয়, আর তাদের জন্যে চিরস্থায়ী শাস্তি রয়েছে। তাদের মধ্য হতে কেউ কোন কথা ছোঁ মেরে নিয়ে পালালে একটা উজ্জ্বল অগ্নিশিখা তার পিছনে ধাওয়া করে। অন্য জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ وَ لَقَدْ جَعَلْنَا فِی السَّمَآءِ بُرُوْجًا وَّ زَیَّنّٰهَا لِلنّٰظِرِیْنَ ـ وَ حَفِظْنٰهَا مِنْ كُلِّ شَیْطٰنٍ رَّجِیْمٍ ـ اِلَّا مَنِ اسْتَرَقَ السَّمْعَ فَاَتْبَعَهٗ شِهَابٌ مُّبِیْنٌ
অর্থাৎ ‘আকাশে আমি স্তম্ভ তৈরী করেছি এবং দর্শকদের জন্যে একে প্রত্যেক বিতাড়িত শয়তান হতে নিরাপদ করেছি। কিন্তু কেউ কোন কথা চুরি করে নিয়ে যায় তখন একটা উজ্জ্বল আলোক শিখা তার পিছু ধাওয়া করে।' (১৫:১৬-১৮) এরকম আরও বহু আয়াত রয়েছে رَجِيْم এর একটা অর্থ رَجْمٌ ও করা হয়েছে। যেহেতু শয়তান মানুষকে কুমন্ত্রণা এবং ভ্রান্তির দ্বারা রজম করে থাকে এ জন্যে তাকে ‘রাজীম' অর্থাৎ ‘রাজেম' বলা হয়।
অতীব মেহেরবান পরম করুণাময় আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি।
সকল সাহাবী (রাঃ) আল্লাহর কিতাব কুরআন মজীদকে বিসমিল্লাহর দ্বারাই আরম্ভ করেছেন। আলেমগণ এ বিষয়ে একমত যে, সূরা-ই-নামল'-এর এটা একটা আয়াত। তবে এটা প্রত্যেক সূরার প্রারম্ভে একটা পৃথক আয়াত কি-না, বা প্রত্যেক সূরার একটা আয়াতের অংশ বিশেষ কি-না, কিংবা এটা কি শুধুমাত্র সূরা-ই-ফাতিহারই আয়াত-অন্য সূরার নয়, কিংবা এক সূরাকে অন্য সূরা হতে পৃথক করার জন্যেই কি একে লিখা হয়েছে এবং এটা আয়াত নয়, এ সব বিষয়ে বেশ মতভেদ রয়েছে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যুগের আলেমগণের মধ্যে এ ব্যাপারে মতবিরোধ চলে আসছে এবং আপন স্থানে এর বিস্তারিত বিবরণও রয়েছে। সুনান-ই-আবি দাউদে সহীহ সনদের সঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে এক সূরাকে অন্য সূরা হতে অনায়াসে পৃথক করতে পারতেন না। ‘মুসতাদরিক-ই-হাকিমের মধ্যেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। একটা মুরসাল হাদীসে হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রাঃ) হতেও হাদীসটি রেওয়ায়িত করা হয়েছে। সহীহ ইবনে খুযাইমার মধ্যে হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) “বিসমিল্লাহ'-কে সূরা-ই-ফাতিহার পূর্বে নামাযে পড়েছেন এবং তাকে একটা পৃথক আয়াতরূপে গণনা করেছেন। কিন্তু এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী উমার বিন হারূন বালখী উসূলে হাদীসের পরিভাষায় দুর্বল। এর অনুসরণে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতেও একটা হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং অনুরূপভাবে হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ হতেও বর্ণিত আছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ), হযরত আতা' (রঃ), হযরত তাউস (রঃ), হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত মাকহুল (রঃ) এবং হযরত যুহরীর (রঃ) এটাই নীতি ও অভিমত যে, ‘বিসমিল্লাহ' সূরা-ই-বারাআত' ছাড়া কুরআনের প্রত্যেক সূরারই একটা পৃথক আয়াত। এসব সাহাবী (রাঃ) ও তাবেঈ (রঃ) ছাড়াও হযরত আবদুল্লাহ বিন মুবারক (রঃ), ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদের (রঃ) একটি কাওলে এবং ইসহাক বিন রাহওয়াহ (রঃ) ও আবু উবাইদ কাসিম বিন সালামেরও (রঃ) এটাই মাযহাব। তবে ইমাম মালিক (রঃ) এবং ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ও তাঁদের সহচরগণ বলেন যে, ‘বিসমিল্লাহ' সূরা-ই-ফাতিহারও আয়াত নয় বা অন্য কোন সূরারও আয়াত নয়।
ইমাম শাফিঈর (রঃ) একটি কাওল এই যে, এটা সূরা-ই-ফাতিহার একটি আয়াত বটে কিন্তু অন্য কোন সূরার আয়াত নয়। তার একটা কাওল এও আছে যে, এটা প্রত্যেক সূরার প্রথম আয়াতের অংশ বিশেষ। কিন্তু হাদীসের পরিভাষায় এই দুই কাওল বা উক্তিই হচ্ছে গারীব। দাউদ (রঃ) বলেন যে, এটা প্রত্যেক সূরার প্রথমে একটা পৃথক আয়াত-সূরার অন্তর্ভুক্ত নয়। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে এবং আবু বকর রাযী, আবু হাসান কুরখীরও এ মাযহাবই বর্ণনা করেছেন। তিনি ইমাম আবু হানীফার (রঃ) একজন বড় মর্যাদাসম্পন্ন সহচর। এ হল বিসমিল্লাহর সূরা-ই-ফাতিহার আয়াত হওয়া না হওয়ার আলেচনা। এখন একে উচ্চৈঃস্বরে পড়তে হবে না নিম্নস্বরে এ নিয়েও মতভেদের অবকাশ রয়েছে। যারা একে সূরা-ই-ফাতিহার পৃথক একটা আয়াত মনে করেন তারা একে নিম্নস্বরে পড়ার পক্ষপাতি। এখন অবশিষ্ট রইলেন শুধু ঐ সব লোক যাঁরা বলেন যে, এটা প্রত্যেক সূরার প্রথম। তাঁদের মধ্যেও আবার মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফিঈর (রঃ) মাযহাব এই যে, সূরাই-ফাতিহা ও প্রত্যেক সূরার পূর্বে একে উচ্চৈঃস্বরে পড়তে হবে। সাহাবা (রাঃ), তাবেঈন (রঃ) এবং মুসলমানদের পূর্ববর্তী যুগের ইমামগণের এটাই মাযহাব। সাহাবীগণের (রাঃ) মধ্যে একে উচ্চৈঃস্বরে পড়ার পক্ষপাতি হলেন হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ), হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুআবিয়া (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উসমান (রাঃ)। হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উসমান (রাঃ) হতেও গারীব বা দুর্বল সনদে ইমাম খতীব (রঃ) এটা নকল করেছেন। বায়হাকী (রঃ) ও ইবনে আবদুল বারী (রঃ) হযরত উমার (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) হতেও এটা বর্ণনা করেছেন। তাবেঈগণের মধ্যে হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত আবু কালাবাহ (রঃ), হযরত যুহরী (রঃ), হযরত আলী বিন হাসান (রঃ), তাঁর ছেলে মুহাম্মদ সাঈদ বিন মুসাইয়াব (রঃ), আতা’ (রঃ), তাউস (রঃ), মুজাহিদ (রঃ), সা'লিম (রঃ), মুহাম্মদ বিন কা'ব কারজী (রঃ), উবাইদ (রঃ), আবূ বকর বিন মুহাম্মদ বিন আমর (রঃ), ইবনে হারাম আবূ ওয়ায়েল (রঃ), ইবনে সীরীন (রঃ), মুহাম্মদ বিন মুনকাদির (র), আলী বিন আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রঃ), তাঁর ছেলে মুহাম্মদ নাফি, ইবনে উমারের (রাঃ) গোলাম (রঃ), যায়েদ বিন আসলাম (রঃ), উমার বিন আবদুল আযীয (রঃ), আরযাক বিন কায়েস (রঃ), হাবীব বিন আবি সাবিত (রঃ), আবু শা’শা' (রঃ), মাকহুল (রঃ), আবদুল্লাহ বিন মুগাফফাল বিন মাকরান (রঃ), এবং বায়হাকীর বর্ণনায় আবদুল্লাহ বিন সাফওয়ান (রঃ), মুহাম্মদ বিন হানাফিয়্যাহ (রঃ) এবং আবদুল বারের বর্ণনায় আমর বিন দীনার (রঃ)। এরা সবাই নামাযের যেখানে কিরআত উচ্চৈঃস্বরে পড়া হয়, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীমকেও উচ্চ শব্দে পড়তেন। এর একটি প্রধান দলীল এই যে, এটা যখন সূরা ই ফাতিহারই একটা আয়াত তখন পূর্ণ সূরার ন্যায় একে উচ্চৈঃস্বরে পড়তে হবে। তাছাড়া সুনান-ই-নাসাঈ, সহীহ ইবনে খুযাইমা, সহীহ ইবনে হিব্বান, মুসতাদরিক-ই- হাকিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) নামায পড়লেন এবং কিরাআতে উচ্চ শব্দে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়লেন এবং নামায শেষে বললেনঃ “তোমাদের সবার চাইতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামাযের সঙ্গে আমার নামাযেরই সামঞ্জস্য বেশী। দারকুতনী, খাতীব এবং বায়হাকী প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। সুনান-ই-আবি দাউদ ও জামেউত তিরমিযীর মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' দ্বারা নামায আরম্ভ করতেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, হাদীসটি খুব সঠিক নয়। মুসতাদরিক-ই-হাকিমের মধ্যে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীমকে ' উচ্চৈঃস্বরে পড়তেন। ইমাম হাকীম (রঃ) এ হাদীসকে সঠিক বলেছেন। সহীহ বুখারীতে আছে যে, হযরত আনাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কিরাআত কিরূপ ছিল? তিনি বললেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক খাড়া শব্দকে লম্বা করে পড়তেন। অতঃপর তিনি بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ পাঠ করে শুনালেন এবং বললেন بِسْمِ اللّٰهِ -কে মদ (লম্বা) করেছেন الرَّحْمٰنِ -এর উপর মদ করেছেন ও الرَّحِیْمِ-এর উপর মদ করেছেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সুনান-ই-আবি দাউদ, সহীহ ইবনে খুযাইমা এবং মুসতাদরিক-ই-হাকিমে হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক আয়াত শেষে থামতেন এবং তাঁর কিরাআত পৃথক পৃথক হতো। যেমন بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ পড়ে থামতেন, তারপর اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ পড়তেন, পুনরায় থেমে مٰلِكِ یَوْمِ الدِّیْنِ পড়তেন। এইভাবে তিনি পড়তেন। দারাকুতনী (রঃ) এ হাদীসটিকে সঠিক বলেছেন। ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম হাকিম (রঃ) হয়রত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) মদীনায় নামায পড়ালেন এবং ‘বিসমিল্লাহ' পড়লেন না। সে সময় যেসব মুহাজির সাহাবী (রাঃ) উপস্থিত ছিলেন তাঁরা এতে আপত্তি জানালেন। সুতরাং তিনি পুনরায় যখন নামায পড়ানোর জন্য দাড়ালেন তখন ‘বিসমিল্লাহ' পাঠ করলেন। প্রায় নিশ্চিতরূপেই উল্লিখিত সংখ্যক হাদীস এ মাযহাবের দলীলের জন্যে যথেষ্ট। এখন বাকী থাকলে তাদের বিপক্ষের হাদীস, বর্ণনা, সনদ, দুর্বলতা ইত্যাদি। ওগুলোর জন্যে অন্য জায়গা রয়েছে।
দ্বিতীয় মাযহাব এই যে, ‘বিসমিল্লাহ’ জোরে পড়তে হবে না। খলীফা চতুষ্টয়, আবদুল্লাহ বিন মুগাফফাল, তাবেঈন ও পরবর্তী যুগের দলসমূহ হতে এটা সাব্যস্ত আছে। আবূ হানীফা (রঃ), সাওরী (রঃ) এবং আহমদ বিন হাম্বলের (রঃ) এটাই মাযহাব। ইমাম মালিকের (রঃ) মাযহাব এই যে, ‘বিসমিল্লাহ' পড়তেই হবে না, জোরেও নয়, আস্তেও নয়। তাঁর প্রথম দলীল তো সহীহ মুসলিমের হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি যাতে রয়েছে যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযকে তাকবীর ও কিরাআতকে اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ দ্বারা শুরু করতেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে আছে যে, হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ ‘আমি নবী (সঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ) এবং হযরত উসমানের (রাঃ) পিছনে নামায পড়েছি। তারা সবাই اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ দ্বারা নামায আরম্ভ করতেন। সহীহ মুসলিমের মধ্যে আছে যে, বিসমিল্লাহ বলতেন না। কিরাআতের প্রথমেও না, শেষেও না। সুনানের মধ্যে হযরত মাগফাল (রাঃ) হতেও এরূপই বর্ণিত আছে। এ হলো ঐসব ইমামের ‘বিসমিল্লাহ' আস্তে পড়ার দলীল। এ প্রসঙ্গে এটাও স্মর্তব্য যে, এ কোন বড় রকমের মতভেদ নয়। প্রত্যেক দলই অন্য দলের নামাযকে শুদ্ধ বলে থাকেন।
বিসমিল্লাহ’র ফযীলতের বর্ণনা
তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত উসমান বিন আফফান (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে ‘বিসমিল্লাহ' সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেনঃ “এ তো আল্লাহ তাআলার নাম। আল্লাহর বড় নাম এবং এই বিসমিল্লাহর মধ্যে এতদুর নৈকট্য রয়েছে যেমন রয়েছে চক্ষুর কালো অংশও সাদা অংশের মধ্যে।” ইবনে মরদুওয়াইর (রঃ) তাফসীরের মধ্যেও এরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে। তাফসীর-ই-ইবনে মরদুওয়াই'-এর মধ্যে এ বর্ণনাটিও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ হযরত ঈসার (আঃ) আম্মা হযরত মরঈয়াম (আঃ) যখন তাঁকে মক্তবে নিয়ে গিয়ে শিক্ষকের সামনে বসালেন তখন তাকে বললেনঃ ‘বিসমিল্লাহ' লিখুন। হযরত ঈসা (আঃ) বললেনঃ ‘বিসমিল্লাহ কি?' শিক্ষক উত্তর দিলেনঃ আমি জানি না।' তিনি বললেনঃ ب -এর ভাবার্থ হলো بَهَاءُ اللّٰهِ অর্থাৎ আল্লাহর উচ্চতা।' س -এর ভাবার্থ হলো سَنَاءُهُ অর্থাৎ আল্লাহর আলোক। م -এর তাৎপর্য হলো مُمْلِكَتُهٗ বা আল্লাহর রাজত্ব। الله বলে উপাস্যদের উপাস্যকে। رَحْمٰن-বলে দুনিয়া ও আখেরাতের করুণাময় কৃপানিধানকে, এবং আখেরাতে যিনি দয়া প্রদর্শন করবেন তাকে رَحِيْم বলা হয়। তাফসীর-ই-ইবনে জারীরের মধ্যেও এ বর্ণনাটি রয়েছে। কিন্তু সনদের দিক দিয়ে তা খুবই গরীব বা দুর্বল। হতে পারে যে, এটি কোন সাহাবী (রাঃ) প্রমুখ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে কিংবা হতে পারে যে, বানী ইসরাঈলের বর্ণনাসমূহের মধ্যে এটা একটা বর্ণনা। এর মারফু হাদীস হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। অবশ্য আল্লাহ পাকই এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের একমাত্র অধিকারী।
ইবনে মরদুওয়াই এর তাফসীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমার উপর এমন একটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে যার মত আয়াত হযরত সুলাইমান ছাড়া অন্য কোন নবীর উপর অবতীর্ণ হয়নি। আয়াতটি হলো ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম'।' হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন পূর্ব দিকে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, বায়ু মণ্ডলী স্তব্ধ হয়ে যায়, তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ সমুদ্র প্রশান্ত হয়ে উঠে, জন্তুগুলো কান লাগিয়ে মনোযোগ সহকারে শুনতে থাকে, আকাশ থেকে অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হয়ে শয়তানকে বিতাড়ন করে এবং বিশ্বপ্রভু স্বীয় সম্মান ও মর্যাদার কসম করে বলেনঃ “যে জিনিসের উপর আমার এ নাম নেওয়া যাবে তাতে অবশ্যই বরকত হবে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, দোযখের ১৯টি দারোগার হাত হতে যে বাঁচতে চায় সে যেন ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' পাঠ করে। এতেও ঘটেছে ১৯টি অক্ষরের সমাবেশ। প্রত্যেকটি অক্ষর প্রত্যেক ফেরেশতার জন্যে রক্ষক হিসেবে কাজ করবে। কুরতবীর সমর্থনে ইবনে আতিয়াহ্ এটা বর্ণনা করেছেন এবং এর পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি আরও একটি হাদীস এনেছেন। তাতে রয়েছেঃ “আমি স্বচক্ষে ত্রিশের বেশী ফেরেশতা দেখেছি যারা এটা নিয়ে তাড়াহুড়া করছিলেন। এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ) সেই সময় বলেছিলেন যখন একটি লোক رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ حَمْدًا كَثِيْرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيْهِ পাঠ করেছিলেন। এর মধ্যে ত্রিশের বেশী অক্ষর রয়েছে। তৎসংখ্যক ফেরেশতাও অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এ রকমই বিসমিল্লাহ’র মধ্যে উনিশটি অক্ষর আছে এবং তথায় ফেরেশতার সংখ্যাও হবে উনিশ। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর। সোয়ারীর উপর তার পিছনে যে সাহাবী (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন তাঁর বর্ণনাটি, এইঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উষ্ট্ৰীটির কিছু পদস্খলন ঘটলে আমি বললাম যে শয়তানের সর্বনাশ হোক। তখন তিনি বললেনঃ এরূপ বলো না, এতে শয়তান গর্বভরে ফুলে উঠে। এবং মনে করে যে, যেন সেইই স্বীয় শক্তির বলে ফেলে দিয়েছে। তবে হাঁ, ‘বিসমিল্লাহ' বলাতে সে মাছির মত লাঞ্ছিত ও হৃগর্ব হয়ে পড়ে।' ইমাম নাসাঈ (রঃ) স্বীয় কিতাব ‘আমালুল ইয়াওমে ওয়াল লাইলাহ' এর মধ্যে এবং ইবনে মরদুওয়াই (রঃ) স্বীয় তাফসীরের মধ্যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং সাহাবীর (রাঃ) নাম বলেছেন উসামা বিন উমায়ের (রাঃ)। আর তার মধ্যেই আছেঃ ‘বিসমিল্লাহ’ বল। এটা একমাত্র বিসমিল্লাহরই বরকত।' এ জন্যেই প্রত্যেক কাজ ও কথার প্রারম্ভে বিসমিল্লাহ বলা মুসতাহাব। খুৎবার শুরুতেও বিসমিল্লাহ বলা উচিত। হাদীসে আছে যে, বিসমিল্লাহর দ্বারা যে কাজ আরম্ভ করা না হয় তা কল্যাণহীন ও বরকতশূন্য থাকে। পায়খানায় যাওয়ার সময়ও বিসমিল্লাহ বলবে। মুসনাদ-ই- আহমাদ এবং সুনানের মধ্যে রয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ), হযরত সাঈদ বিন যায়েদ (রাঃ) এবং হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ওজুর সময় বিসমিল্লাহ বলে না তার অর্য হয় না। এ হাদীসটি হাসান বা উত্তম। কোন কোন আলেম তো অযুর সময় বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব বলে থাকেন। প্রাণী যবাই করার সময়েও বিসমিল্লাহ বলা মুসতাহাব। ইমাম শাফিঈ (রঃ) এবং একটি দলের ধারণা এটাই। কেউ কেউ যিকিরের সময় এবং কেউ কেউ সাধারণভাবে একে ওয়াজিব বলে থাকেন। এর বিশদ বর্ণনা ইনশাআল্লাহ আবার অতি সত্বরই আসবে।
ইমাম ফাখরুদ্দনি রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে এই আয়াতটির ফযীলত সম্পর্কে বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন। একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যদি তুমি তোমার স্ত্রীর নিকট গিয়ে সহমিলনের প্রাক্কালে বিসমিল্লাহ পড়ে নাও আর তাতেই যদি আল্লাহ কোন সন্তান দান করেন, তাহলে তার নিজের ও তার সমস্ত ঔরসজাত সন্তানের নিঃশ্বাসের সংখ্যার সমান পূণ্য তোমার আমলনামায় লিখা হবে। কিন্তু এ বর্ণনাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি এটা কোথাও পাইনি। খাওয়ার সময়েও বিসমিল্লাহ পড়া মুসতাহাব। সহীহ মুসলিমে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমার বিন আবু সালামাকে (রঃ) যিনি তাঁর সহধর্মিনী হযরত উম্মে সালমার (রাঃ) পূর্ব স্বামীর পুত্র ছিলেন, বলেনঃ ‘বিসমিল্লাহ বল, ডান হাতে, খাও এবং তোমার সামনের দিক থেকে খেতে থাক।' কোন কোন আলেম এ সময়েও বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব বলে থাকেন। স্ত্রীর সঙ্গে মিলনের সময়েও বিসমিল্লাহ বলা উচিত। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ স্বীয় স্ত্রীর সঙ্গে মিলনের ইচ্ছে করলে যেন সে এটা পাঠ করেঃ بِسْمِ اللهِ اَللّٰهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا অর্থাৎ আল্লাহর নামের সঙ্গে আরম্ভ করছি। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এবং যা আমাদেরকে দান করবেন তাকেও শয়তানের কবল হতে রক্ষা করুন।
তিনি আরও বলেন যে, এই মিলনের ফলে যদি সে গর্ভধারণ করে তবে শয়তান সেই সন্তানের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এখান হতে এটাও জানা গেল যে, বিসমিল্লাহর, ب এর সম্পর্ক কার সঙ্গে রয়েছে।
ব্যাকরণগত শব্দ বিন্যাসঃ
ব্যাকরণবিদগণের এতে দু’টি মত রয়েছে। দুটোই কাছাকাছি। কেউ একে اِسْم বলেন আবার কেউ فِعْل বলেন। প্রত্যেকেরই দলীল প্রমাণ কুরআন থেকে পাওয়া যায়। যারা একে اِسْم-এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে থাকেন তাঁরা বলেনঃ بِسْمِ اللّٰهِ اِبْتِدَائِىْ
অর্থাৎ আমার আরম্ভ আল্লাহর নামের সঙ্গে। কুরআন পাকে রয়েছেঃ (১১:৪১) وَ قَالَ ارْكَبُوْا فِیْهَا بِسْمِ اللّٰهِ مَجْرٖؔىهَا وَ مُرْسٰىهَاؕ-اِنَّ رَبِّیْ لَغَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ এ আয়াতে اِسْم অর্থাৎ مَصْدَر প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে। আর যারা একে فِعْل-এর সঙ্গে উহ্য বলে থাকেন সে اَمْر ـ فِعْل ই হোক বা خَبْر ই হোক, যেমন اِيْدَا بِسْمِ اللّٰهِ এবং بَدَاْتُ بِسْمِ اللّٰهِ তাদের দলীল হচ্ছে কুরআন কারীমের এই নিরূপ আয়াতটিঃ اِقْرَاْ بِسْمِ رَبِّكَ الَّذِيْ خَلَقَ প্রকৃতপক্ষে দুটোই সঠিক ও শুদ্ধ। কেননা, فِعْل এর জন্যেও مَصْدَر হওয়া জরুরী। তাহলে এটা ইচ্ছাধীন রয়েছে যে, فِعْل কে উহ্য মনে করা হোক এবং ওর مَصْدَر কে সেই فِعْل অনুসারে দাঁড় করানো হোক যার নাম পূর্বে নেয়া হয়েছে। দাঁড়ান হোক, বসা হোক, খানাপিনা হোক, কুরআন পাঠ হোক বা অযু ও নামায ইত্যাদি হোক, এসবের প্রথমে বরকত লাভের উদ্দেশ্যে সাহায্য চাওয়ার জন্যে এবং প্রার্থনা মঞ্জুরীর জন্যে আল্লাহর নাম নেয়া ইসলামী শরীয়তের একটি বিধান। আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচাইতে ভাল জানেন। ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতিমের তাফসীর ও মুসনাদে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সর্বপ্রথম যখন হযরত জিব্রাঈল (আঃ) হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর নিকট ওয়াহী নিয়ে আসেন তখন বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! বলুন– اَسْتَعِيْذُ بِاللهِ السَّمِيْعِ الْعَلِيْمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ আবার বলুনঃ بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ
উদ্দেশ্য ছিল যেন উঠা, বসা, পড়া, খাওয়া সব কিছুই আল্লাহর নামে আরম্ভ হয়।
اِسْمٌ ইসম শব্দটির তাহকীকঃ
اِسْمٌ অর্থাৎ নামটাই কি ‘মুসাম্মা’ অর্থাৎ নামযুক্ত না অন্য কিছু? এ ব্যাপারে তিন দল আলিমের তিন রকম উক্তি রয়েছে। প্রথম এই যে, নামটাই হচ্ছে মুসাম্মা বা নামযুক্ত। আবু উবাইদাহ এবং সিবওয়াইয়ের কথা এটাই। বাকিল্লানী এবং ইবনে ফুরকও এটাই পছন্দ করেন। মুহাম্মদ ইবনে উমর ইবনে খাতীব রাজী স্বীয় তাফসীরের সূচনায় লিখেছেনঃ “হাসভিয়্যাহ কারামিয়্যাহ এবং আশরিয়্যাহগণ বলেন যে, اِسْم হলো نَفْسِ مُسَمّٰى কিন্তু نَفْسِ تَسْمِيَّة হতে পৃথক এবং মুতাযিলারা বলেন যে, اِسْم হলো نَفْسِ تَسْمِيَّة কিন্তু نَفْسِ مُسَمّٰى হতে আলাদা। আমাদের মতে اِسْم টা مُسَمّٰى ও غَيْرِمُسَمّٰى দু'টো থেকেই আলাদা। আমরা বলি যে, যদি اِسْم-এর উদ্দেশ্যে لَفْظ হয় যা শব্দসমূহের অংশ বা অক্ষরসমূহের সমষ্টি, তবে তো এটা অবশ্যম্ভাবীরূপে সাব্যস্ত হয় যে, এটা مُسَمّٰى হতে পৃথক। আর যদি اِسْم হতে উদ্দেশ্য হয় ذَاتِ مُسَمّٰى তবে তো এ একটা স্পষ্টকে স্পষ্ট করার কাজ যা শুধু নিরর্থক ও বাজে কাজেরই নামান্তর। সুতরাং এটা সুস্পষ্ট কথা যে, বাজে আলোচনায় সময়ের অপচয় একটা নিছক অনর্থক কাজ। অতঃপর اِسْم ও مُسَمّٰى কে পৃথকীকরণের উপর দলীল প্রমাণ আনা হয়েছে যে, কখনও اِسْم হয় কিন্তু مُسَمّٰى মোটেই হয় না। যেমন مَعْدُوْم বা অস্তিত্বহীন শব্দটি। কখনও আবার একটি مُسَمّٰى কয়েকটি اِسْم হয়। যেমন مُتَرَادِفُ বা একার্থবোধক শব্দ। আবার কখনও اِسْم একটি হয় এবং مُسَمّٰى হয় কয়েকটি। যেমন مُشْتَرِك, সুতরাং বুঝা গেল যে, اِسْم ও مُسَمّٰى এক জিনিস নয়। অর্থাৎ নাম এক জিনিস এবং ‘মুসাম্মা’ বা নামধারী অন্য জিনিস। কারণ যদি اِسْم কেই مُسَمّٰى ধরা হয় তবে আগুনের নাম নেয়া মাত্রই তার দাহন ও গরম অনুভূত হওয়া উচিত এবং বরফের নাম নিলেই ঠাণ্ডা অনুভূত হওয়া। দরকার। অথচ কোন জ্ঞানীই একথা বলেন না-বলতে পারেন না। এর দলীল প্রমাণ এই যে, আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ রয়েছেঃ وَلِلّٰهِ الْاَسْمَاءُ الْحُسْنٰى فَادْعُوْهُ بِهَا
অর্থাৎ আল্লাহর অনেক উত্তম নাম রয়েছে, তোমরা ঐসব নাম দ্বারা আল্লাহকে ডাকতে থাক। হাদীস শরীফে আছে যে, আল্লাহ তা'আলার ৯৯টা নাম আছে। তাহলে চিন্তার বিষয় যে, নাম কত বেশী আছে। অথচ مُسَمّٰى একটিই এবং তিনি হলেন অংশীবিহীন এক অদ্বিতীয় আল্লাহ। এরকমই اَسْمَاءُ কে এ আয়াতে اَلله-এর দিকে সম্বন্ধ লাগান হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ فَسَبِّحْ بِاسْمِ رَبِّكَ الْعَظِيْمِ ইত্যাদি। اِضَافَت-ও এটাই চায় যে, اِسْم ও مُسَمّٰى অর্থাৎ নাম ও নামধারী আলাদা জিনিস। কারণ اِضَافَت দ্বারা সম্পূর্ণ অন্য এক বিরোধী বস্তুকে বুঝায়। এরকমই আল্লাহ তা'আলার উপরোক্ত নির্দেশঃ فَادْعُوْهُ بِهَا
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলাকে তাঁর নামসমূহ দ্বারাই ডাক। এটাও এ বিষয়ের দলীল প্রমাণ যে, নাম এক জিনিস এবং নামধারী আলাদা জিনিস। এখন যারা اِسْم ও مُسَمّٰى কে এক বলেন তাদের দলীল এই যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ تَبٰرَكَ اسْمُ رَبِّكَ ذِی الْجَلٰلِ وَ الْاِكْرَامِ অর্থাৎ তোমার মহান প্রভুর অতি সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন কল্যাণময় নাম রয়েছে।' (৫৫:৭৮) নামকে কল্যাণময় ও মর্যাদাসম্পন্ন বলা হয়েছে, অথচ স্বয়ং আল্লাহই কল্যাণময়। এর সহজ উত্তর এই যে, সেই পবিত্র প্রভুর কারণেই তাঁর নামও শ্রেষ্ঠত্বপূর্ণ হয়েছে। তাদের দ্বিতীয় দলীল এই যে, যখন কোন ব্যক্তি বলেঃ যয়নাবের উপর তালাক’, তখন তালাক শুধু সেই ব্যক্তির ঐ স্ত্রীর উপর হয়ে থাকে যার নাম যয়নাব। যদি নাম ও নামধারীর মধ্যে পার্থক্য থাকতো তবে শুধু নামের উপরই তালাক পড়তো, নামধারীর উপর কি করে পড়তো? এর উত্তর এই যে, এ কথার ভাবার্থ হয় এইরূপঃ যার নাম যয়নাব তার উপর তালাক। تَسْمِيَّة এর اِسْم হতে আলাদা হওয়া এই দলীলের উপর ভিত্তি করে যে, تَسْمِيَّة বলা হয় কারও নাম নির্ধারণ করাকে। আর এটা সুস্পষ্ট কথা যে, এটা এক জিনিস এবং নামধারী অন্য জিনিস। ইমাম রাযীর (রঃ) কথা এটাই। এ সবকিছু بِاسْم-এর সম্পর্কে আলোচনা ছিল। এখন اَللّٰه শব্দ সম্পর্কে আলোচনা শুরু হচ্ছে।
اَلله আল্লাহ শব্দটির তাহকীকঃ
اَللهُ বরকত বিশিষ্ট ও উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন মহান প্রভুর একটি বিশিষ্ট নাম। বলা হয় যে, এটাই اِسْمِ اَعْظَم কেননা, সমুদয় উত্তম গুণের সঙ্গে এটাই গুণান্বিত হয়ে থাকে। যেমন পবিত্র কুরআনে রয়েছেঃ هُوَ اللّٰهُ الَّذِیْ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَۚ-عٰلِمُ الْغَیْبِ وَ الشَّهَادَةِۚ-هُوَ الرَّحْمٰنُ الرَّحِیْمُ ـهُوَ اللّٰهُ الَّذِیْ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَۚ-اَلْمَلِكُ الْقُدُّوْسُ السَّلٰمُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَیْمِنُ الْعَزِیْزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُؕ-سُبْحٰنَ اللّٰهِ عَمَّا یُشْرِكُوْنَ ـهُوَ اللّٰهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ لَهُ الْاَسْمَآءُ الْحُسْنٰىؕ-یُسَبِّحُ لَهٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِۚ-وَ هُوَ الْعَزِیْزُ الْحَكِیْمُ অর্থাৎ তিনিই সেই আল্লাহ যিনি ছাড়া অন্য কেউ উপাস্য নেই, তিনি প্রকাশ্য ও অদৃশ্য বস্তুসমূহের জ্ঞাতা, তিনি বড়ই মেহেরবান, পরম দয়ালু। তিনি এমন উপাস্য যে, তিনি ছাড়া আর কেউ উপাস্য নেই, তিনি বাদশাহ, পবিত্র, নিরাপত্তা প্রদানকারী, আশ্রয়দাতা, রক্ষাকর্তা, প্রবল মহাপরাক্রম গর্বের অধিকারী, সুমহান। আল্লাহ তাআলা মানুষের অংশীবাদ হতে পবিত্র। তিনি সষ্টিকারী, উদ্ভাবন কর্তা, রূপশিল্পী তাঁরই জন্য উত্তম উত্তম নামসমূহ রয়েছে, তিনি মহান পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।' (৫৯:২২-২৪) এ আয়াতসমূহে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সবগুলোই গুণবাচক নাম এবং ওগুলো ‘আল্লাহ’ শব্দেরই বিশেষণ। সুতরাং মূল ও প্রকৃত নাম ‘আল্লাহ’। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ وَلِلهِ الْاَسْمَاءُ الْحُسْنٰى فَدْعُوْهُ بِهَا অর্থাৎ আল্লাহর জন্যে পবিত্র ও উত্তম নাম রয়েছে, সুতরাং তোমরা তাঁকে ঐসব নাম ধরে ডাক।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলার নিরানব্বইটি নাম রয়েছে। এক শতের একটা কম। যে ওগুলো গণনা করবে সে বেহেশতে প্রবেশ করবে। 'জামেউত তিরমিযী ও সুনান-ই-ইবনে মাজার বর্ণনায় এ নামগুলোর ব্যাখ্যাও এসেছে। ঐ দুই হাদীস গ্রন্থের বর্ণনায় শব্দের কিছু পার্থক্য আছে এবং সংখ্যায় কিছু কম-বেশী রয়েছে। ইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে কোন কোন লোক হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর পাঁচ হাজার নাম আছে। এক হাজার নাম তো কুরআন মাজীদ ও হাদীসে রয়েছে, এক হাজার আছে তাওরাতে, এক হাজার আছে ইঞ্জিলে, এক হাজার আছে যাবুরে এবং এক হাজার আছে লাওহে মাহফুযে'। ‘আল্লাহ’ এমন একটি নাম যা একমাত্র আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা ছাড়া আর কারও নেই। এ কারণেই এর মূল উত্স কি তা আরবদের নিকটেও অজানা রয়েছে। এমনকি بَاب এর ও তাদের জানা নেই। বরং ব্যাকরণবিদগণের একটি বড় দলের ধারণা যে, এটা اِسْم جَامِد অর্থাৎ এটা কোন কিছু হতে বের হয়নি এবং এটা হতেও অন্য কিছু বের হয়নি। কুরতুবি (রঃ) উলামা-ই-কিরামের একটি বিরাট দলের পক্ষ থেকে এই নীতিটি নকল করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম শাফেঈ (রঃ), ইমাম খাত্তাবী (রঃ), ইমামুল হারামাইন (রঃ), ইমাম গাযযালী (রঃ) প্রমুখ বিদগ্ধ মনীষীগণ। খলীল (রঃ) এবং সিবওয়াইহ্ (রঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, اَلِف لَام এতে আবশ্যকীয়। ইমাম খাত্তাবী (রঃ)-এর প্রমাণরূপে বলেছেন যে, يَاالله তো বলা হয়ে থাকে কিন্তু يَارَحْمٰن বলতে শুনা যায় না। যদি اَلله শব্দের اَلِف لَام মূল শব্দের অন্তর্ভুক্ত হতো তবে আহ্বান সূচক শব্দ يَا ব্যবহৃত হতো না। কেননা, আরবী ব্যাকরণ অনুসারে اَلِف لَام বিশিষ্ট اِسْم-এর পূর্বে আহ্বান সূচক শব্দের ব্যবহার বৈধ নয়। কোন কোন বিদ্বান লোকের এ অভিমতও রয়েছে যে, এ শব্দটি মূল উৎস বিশিষ্ট। তারা এর দলীলরূপে রূবা ইবনু আজ্জাজের একটি কবিতা পেশ করেন। কবিতাটি নিম্নরূপঃ لِلهِ دَرُّ الْغَانِيَاتِ الْمُدَّةِ ـ سَبَحْنَ وَاسْتَرْجَعْنَ مِنْ تَاَلُّهِىْ এতে مَصْدَر হিসেবে تَاَلُّهِىْ-এর বর্ণনায় আছে যার مَاضِى ـ مَصْدَر ও مُضَارِع হয় اَلَهَ يَاْلَهُ اُلْهَةً وَتَاَلُّهًا যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। যে, তিনি يَذَرُكَ وَاٰلِهَتَكَ পড়তেন। এর ভাবার্থ হলো ইবাদত। অর্থাৎ তার উপাসনা করা হয় এবং তিনি কারও উপাসনা করেন না। মুজাহিদ (রঃ) প্রমুখ মনীষীবৃন্দ বলেনঃ “আলোচ্য শব্দটি مُشْتَق বা অন্য শব্দ থেকে নির্গত হওয়ার অনুকূলে। কেউ কেউ وَهُوَ اللهُ فِى السَّمٰوٰتِ وَفِى الْاَرْضِ এই আয়াতকে দলীলরূপে এনেছেনঃ অনুরূপভাবে অন্য আয়াতেও আছেঃ وَ هُوَ الَّذِیْ فِی السَّمَآءِ اِلٰهٌ وَّ فِی الْاَرْضِ اِلٰهٌؕ অর্থাৎ
‘আসমানে ও যমীনে তিনিই একমাত্র আল্লাহ।' (৪৩:৮৪)এবং তিনিই একমাত্র সত্ত্বা যিনি আকাশেও উপাস্য এবং পৃথিবীতেও উপাস্য। সিবওয়াইহ (রঃ) খলীল (রঃ) থেকে নকল করেছেন যে, اَللهُ মূলে ছিল اَلٰهٌ যেমন فَعَالٌ অতঃপর هَمْزَة-এর পরিবর্তে اَلِف لَام আনা হয়েছে। যেমন اَلنَّاسُ মূলে اُنَاسٌ ছিল। কেউ কেউ বলেন যে, اَللهُ মূলে لَاهٌ ছিল। সম্মানের জন্যে পূর্বে اَلِف لَام আনা হয়েছে। সিবওয়াইহের পছন্দনীয় মত এটাই। আরব কবিদের কবিতার মধ্যেও এ শব্দটি পাওয়া যায়। যেমনঃ لَاهَ ابْنُ عَمِّكَ لَااَفْضَلْتُ فِى حَسَبٍ ـ عَنِّى وَلَااَنْتَ دَيَانِىْ فَتُخْزُوْنِىْ
কাসাই ও ফারা বলেন যে, এটা মূলে ছিল لَااِلٰهَ অতঃপর هَمْزَة কে লুপ্ত করে প্রথম لَام কে দ্বিতীয় لَام এ اِدْغَام করা হয়েছে। لٰكِنَّا هُوَ اللهُ رَبِّىْ-এর মধ্যে لٰكِنَّ اَنَا শব্দদ্বয় لٰكِنْ হয়েছে। হাসানের (রঃ) কিরআতে لٰكِنَّ اَنَا ই রয়েছে। এটা وَلَهٌ হতে নেয়া হয়েছে। এবং এর অর্থ হলো تَحَيَّرَ জ্ঞান লোপ পাওয়াকে وَلَهٌ বলে। আরবী ভাষায় رَجُلٌ وَالِهٌ এবং اِمْرَاَةٌ وُلْهٰى ও مَوْلُوْهَةٌ ঐ সময়ে বলা হয় যখন তাদেরকে বিয়াবান জঙ্গলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহ ও তাঁর গুণাবলীর বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মানুষ হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে বলে সেই পবিত্র সত্ত্বাকে ‘আল্লাহ’ বলা হয়ে থাকে। এদিক দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, এ শব্দটি মূলে وِلَاهٌ ছিল وَاو টি هَمْزَة তে পরিবর্তিত হয়েছে। যেমন وِشَاحٌ শব্দকে اِشَاحٌ ও وِسَادَةٌ শব্দকে اِسَادَةٌ বলা হয়।
ইমাম রাযীর (রঃ) মত এই যে, এই শব্দটি اَلَهْتُ اِلٰى فُلَانٍ হতে নেয়া হয়েছে এবং তা سَكَنْتُ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ আমি অমুক হতে অনাবিল শান্তি ও আরাম লাভ করেছি। কেননা, জ্ঞান ও বিবেকের শান্তি শুধু আল্লাহর যিকরেই রয়েছে এবং আত্মার প্রকৃত খুশী একমাত্র তারই পরিচয়ে রয়েছে। একমাত্র তিনিই হলেন পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ, তিনি ছাড়া অন্য কেউ এরূপ নয়। এ কারণেই তাকে ‘আল্লাহ’ বলা হয়। কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছেঃ اَلَا بِذِكْرِ اللّٰهِ تَطْمَىٕنُّ الْقُلُوْبُ
অর্থাৎ মুমিনদের অন্তর শুধুমাত্র আল্লাহর যিকরের দ্বারাই অনাবিল শান্তি লাভ করে থাকে। (১৩:২৮) এটাও একটা মত যে, শব্দটি لَاهَ يَلُوُهُ হতে নেয়া হয়েছে, যার অর্থ হয় গুপ্ত হওয়া ও পর্দা করা। এও বলা হয়েছে যে, শব্দটি اَلَهَ الْفَصِيْل হতে গৃহীত হয়েছে। বান্দা যেহেতু বিনয়ের সাথে সদা তার দিকে ঝুঁকে থাকে এবং সর্বাবস্থায়ই তাঁরই কৃপা ও করুণার অঞ্চল ধরে থাকে, সেহেতু তাকে আল্লাহ বলা হয়। একটা মত এও আছে যে, আরবের লোকেরা اَلَهَ الرَّجُلُ يَاْلَهُ ঐ সময়ে বলে যখন কেউ কোন দৈব দুর্ঘটনার ফলে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং অনন্য তাকে আশ্রয় দেয় ও রক্ষা করে। যেহেতু সমস্ত সৃষ্টজীবকে বিপদ হতে মুক্তিদাতা একমাত্র মহান আল্লাহ, তাই তাকে ‘আল্লাহ’ বলা হয়। যেমন কুরআন পাকে রয়েছেঃ هُوَ يُجِيْرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ অর্থাৎ তিনিই রক্ষা করেন ও আশ্রয় দেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কাউকেও রক্ষা করা যায় না।' (২৩:৮৯) আর প্রকৃত অনুগ্রহকারী একমাত্র তিনিই। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেনঃ وَ مَا بِكُمْ مِّنْ نِّعْمَةٍ فَمِنَ اللّٰهِ
অর্থাৎ তোমাদের উপর যতগুলো দান রয়েছে সবই আল্লাহ প্রদত্ত। তিনিই আহার দাতা। (১৬:৫৩) সুতরাং তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেনঃ وَهُوَ يُطْعِمُ وَلَايُطْعَمُ অর্থাৎ তিনিই আহার্য দেন তাঁকে আহার্য দেয়া হয় না। (৬:১৪) তিনিই প্রত্যেক জিনিসের আবিষ্কারক। তাই তিনি বলেনঃ قُلْ كُلٌّ مِّنْ عِنْدِ اللّٰهِ অর্থাৎ তুমি বল-আল্লাহর তরফ হতেই প্রত্যেক জিনিসের অস্তিত্ব লাভ হয়েছে।' (৪:৭৮) ইমাম রাযীর (রঃ) গৃহীত মাযহাব এই যে اَلله শব্দটি مُشْتَق নয়। খলীল (রঃ), সিবওয়াইহ (রঃ) এবং অধিকাংশ উসূলিয়ীন ও ফাকীহদের এটাই অভিমত। এর অনেক দলীল-প্রমাণও রয়েছে। এটি مُشْتَق হলে এর অর্থের মধ্যেও বহু একক শব্দও জড়িত থাকতো। অথচ এরূপ হয় না। আবার শব্দটিকে مَوْصُوْف বানানো হয় এবং এর অনেকগুলো صِفَت ও আসে। যেমন রহমান রাহীম’ ‘মালিক কদুস' ইত্যাদি। সুতরাং বুঝা গেল যে, এটা مُشْتَق নয়। কুরআন মাজীদের এক জায়গায় আছে عَزِيْزِ الْحَمِيْدِ اللهِ এখানে এটা عَطْف بَيَان হয়েছে। আলোচ্য শব্দটির مُشْتَق না হওয়ার একটি দলীল প্রমাণ রূপে নিম্নের هَلْ تَعْلَمْ لَهٗ سَمِيًّا (১৯:৬৫) এই আয়াতটি বর্ণনা করা হয়। আল্লাহ তাআলাই এ ব্যাপারে সবচাইতে ভাল জানেন।
কোন কোন লোক একথাও বলেছেন যে, اَللهُ শব্দ আরবী নয় বরং (রঃ) ইরানী শব্দ। কিন্তু ইমাম রাযী (রঃ) একে দুর্বল বলেছেন এবং আসলেও এটা দুর্বল। ইমাম রাযী (রঃ) বলেন যে, মাখলুক' বা সৃষ্টজীব দুই প্রকার। এক প্রকার হলেন তারাই যারা আল্লাহর মারিফাতের সাগর সৈকতে পৌছে গেছেন। দ্বিতীয় প্রকার হলো ওরাই যারা তা হতে বঞ্চিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বরং সে বিস্ময়ের অন্ধকারে এবং বন্ধুর কন্টকাকীর্ণ উপত্যকায় পড়ে রয়েছে এবং সমস্ত আধ্যাত্মিক শক্তি সে হারিয়ে ফেলে একেবারে নিঃস্ব ও রিক্তহস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু যে ব্যক্তি মারিফাতের ধারে কাছে পৌছে গেছে এবং আল্লাহর নূর ও ঔজ্জ্বল্যের বাগানে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে থেমে গেছে সে সেখানেই দিশেহারা ও হতভম্ব হয়ে রয়ে গেছে। মোট কথা কেউ পূর্ণভাবে আল্লাহর পরিচিতি লাভ করতে পারেনি। সুতরাং এখন সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, সেই মহান সত্ত্বার নামই ‘আল্লাহ’। সমস্ত সৃষ্টজীব তারই মুখাপেক্ষী, তারই সামনে মস্তক অবনতকারী এবং তাঁকেই অনুসন্ধানকারী। আল্লামা খলীল বিন আহমাদ ফারাহদীর (রঃ) কথা অনুসারে ‘আল্লাহ’ শব্দের অর্থ অন্য উৎস থেকেও করা যেতে পারে। আরবের বাক পদ্ধতিতে প্রত্যেক উঁচু জিনিসকে لَاهَا বলা হয়, আর যেহেতু বিশ্ব প্রভু সবচেয়ে উঁচু ও বড় এ জন্য তাকেও আল্লাহ বলা হয়।
আবার اَلْهٌ-এর অর্থ হলো ইবাদত করা এবং تَاَلُّهٌ-এর অর্থ হলো আদেশ পালন ও কুরবানী করণ আর আল্লাহরই ইবাদত করা হয় এবং তাঁরই নামে কুরবানী দেওয়া হয় বলে তাকেও আল্লাহ বলা হয়। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) কিরাআতে আছে। وَيَذَرُكَ وَاٰلِهَتَكَ-এর মূল হচ্ছে ف ـ اَلْاِلٰهُ কালিমার স্থলে هَمْزَة এসে ওটা লুপ্ত হয়েছে, অতঃপর نَفْس كَلِمَة-এর لَام টি অতিরিক্ত لَام কে تَعْرِيْف-এর জন্য আনা হয়েছিল, তার সঙ্গে মিলে গেছে এবং দুই لَام এ اِدْغَام হয়েছে। ফলে تَشْدِيْد বিশিষ্ট একটা لَام রয়ে গেছে এবং সম্মানের জন্যে اَلله বলা হয়েছে।
اَلرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ আর রহমানির রাহিম
اَلرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ শব্দ দুটিকে رَحْمَت থেকে নেওয়া হয়েছে। অর্থের দিক দিয়ে দু’টোর মধ্যেই মুবালাগাহ' বা আধিক্য রয়েছে, তবে ‘রাহীমের চেয়ে রহমানের মধ্যে আধিক্য বেশী আছে। আল্লামা ইবনে জারীরের (রঃ) কথামত জানা যায় যে, এতে প্রায় সবাই একমত। পূর্ববর্তী যুগের সালফে সালেহীন বা কোন আলেমের তাফসীরের মাধ্যমেও এটা জানা যায়। হযরত ঈসা (আঃ) এই অর্থই নিয়েছেন, যা ইতিপূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে-তা এই যে, রাহমানের অর্থ হলো দুনিয়া ও আখেরাতে দয়া প্রদর্শনকারী এবং রাহীমের অর্থ শুধু আখেরাতে রহমকারী। কেউ কেউ বলেন যে, رَحْمٰن শব্দটি مُشْتَق নয়। কারণ যদি তা এ রকমই হত তবে مَرْحُوْم এর সঙ্গে মিলে যেতো। অথচ কুরআন পাকের মধ্যে وَ كَانَ بِالْمُؤْمِنِیْنَ رَحِیْمًا (৩৩:৪৩) এসেছে। মুরাদের বরাতে ইবনুল আমবারী (রঃ) বলেছেন যে, رَحْمٰن হচ্ছে ইব্রানী নাম, আরবী নয়। আবু ইসহাক যাজ্জাজ ‘মা’আনিল কুরআন' নামক অনবদ্য পুস্তকে লিখেছেন যে, আহমাদ বিন ইয়াহ্ইয়ার মতানুসারে রাহীম আরবী শব্দ এবং রাহমান ইবরানী শব্দ। দুটিকে একত্রিত করা হয়েছে। কিন্তু আবু ইসহাক বলেন যে, এ কথাটি তেমন মনে ধরে না। এ শব্দটি مُشْتَق হওয়ার দলীলরূপে কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, জামেউত তিরমিযীর সহীহ হাদীসে আছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা রয়েছেঃ “আমি রাহমান, আমি রহমকে সৃষ্টি করেছি এবং স্বীয় নাম হতেও এ নামটি বের করেছি। যে একে সংযুক্ত করবে আমিও তাকে যুক্ত করবে এবং যে অকে কেটে দেবে আমিও তাকে কেটে দেব।' এখন প্রকাশ্য হাদীসের বিরোধিতা ও অস্বীকার করার কোন উপায় বা অবকাশ নেই। এখন রইলো কাফিরদের এ নামকে অস্বীকার করার কথাটা। এটা শুধু তাদের অজ্ঞতা, মূর্খতা ও বোকামী ছাড়া আর কিছু নয়। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, ‘রাহমান’ ও ‘রাহীমের একই অর্থ যেমন نَدْمَانٌ ও نَدِيْمٌ শব্দদ্বয়। আবু উবাইদারও (রঃ) একই মত। একটা মত এও আছে যে, فُعْلَانٌ শব্দটি فَعِيْلٌ-এর মত নয় فُعْلَانٌ শব্দের মধ্যে অবশ্যম্ভাবীরূপে مُبَالَغَة হয়ে থাকে। যেমন غَضْبَانٌ ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যে খুবই রাগান্বিত এবং একেবারে অগ্নিশর্মা হয়। আর فَعِيْلٌ শুধু فَاعِل ও مَفْعُوْل এর জন্যই আসে যা مُبَالَغَة শূন্য থাকে। আবু আলী ফারসী বলেন যে, رَحْمٰن শব্দটি সাধারণ اِسْم যা সর্ব প্রকারের দয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং শুধু আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত থাকে। আর ‘রাহীমের সম্পর্ক শুধু মুমিনদের সঙ্গে যেমন আল্লাহ পাক বলেন, وَ كَانَ بِالْمُؤْمِنِیْنَ رَحِیْمًا
অর্থাৎ তিনি মুমিনদের প্রতি দয়ালু। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই দুটি নামই করুণা ও দয়া বিশিষ্ট। একের মধ্যে অন্যের তুলনায় দয়া ও করুণা বেশী আছে। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) এই বর্ণনায় اَرَقٌ শব্দটি রয়েছে। খাত্তাবী ও অন্যেরা এর অর্থ اَرْفَقُ করে থাকেন। যেমন হাদীসের মধ্যে আছেঃ “আল্লাহ তা'আলা رِفْقٌ বিশিষ্ট অর্থাৎ স্ত্র, বিনীয় ও দয়ালু। প্রত্যেক কাজে তিনি বিনয়, তা ও সরলতা পছন্দ করেন। তিনি ম্রতা ও সরলতার প্রতি এমন নিয়ামত বর্ষণ করেন যা কঠোরতার প্রতি করেন না।
ইবনুল মুবারক বলেন, 'রাহমান তাকেই বলে যার কাছে চাইলে তিনি দান করেন, আর রাহীম তাকে বলে যার কাছে না চাইলে তিনি রাগান্বিত হন। জামেউত তিরমিযীতে আছে যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট যে ব্যক্তি চায় না তিনি তার প্রতি রাগান্বিত হন। কোন একজন কবির কবিতায় আছেঃ اَللّٰهُ يَغْضَبُ اِنْ تَرَكْتَ سُوَالَهٗ ـ وَبَنِىْ اٰدَمَ حِيْنَ يُسْئَلُ يَغْضَبُ অর্থাৎ তুমি আল্লাহর নিকট চাওয়া ছেড়ে দিলেই তিনি রাগান্বিত হন, অথচ বনী আদমের নিকট চাওয়া হলে সে অসন্তুষ্ট হয়ে থাকে। আযরামী বলেন যে, রাহমানের অর্থ হলো যিনি সমুদয় সৃষ্ট জীবের প্রতি করুণা বর্ষণকারী। আর রাহীমের অর্থ হলো যিনি মুমিনদের উপর দয়া বর্ষণকারী। যেমন কুরআন কারীমের নিম্নের দু'টি আয়াতের মধ্যে রয়েছেঃ اَلرَّحْمٰنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوٰى ، ثُمَّ اسْتَوٰى عَلَ الْعَرْشِ এখানে মহান আল্লাহ اِسْتَوٰى শব্দের সঙ্গে رَحْمٰن শব্দটির উল্লেখ করেছেন যাতে শব্দটি স্বীয় সাধারণ দয়া ও করুণার অর্থে জড়িত থাকতে পারে। কিন্তু মুমিনদের বর্ণন্যর সঙ্গে رَحِيْم শব্দটির উল্লেখ করেছেন, যেমন বলেছেন وَ كَانَ بِالْمُؤْمِنِیْنَ رَحِیْمًا সুতরাং জানা গেল যে, رَحْمٰن -এর মধ্যে- رَحِيْم -এর তুলনায় مُبَالَغَة অনেক গুণে বেশী আছে। কিন্তু হাদীসের একটি দু'আর মধ্যে يَا رَحْمٰنَ الدُّنْيَا وَالْاٰخِرَةِ وَرَحِيْمَهُمَا এ ভাবেও এসেছে। রাহমান' নামটি আল্লাহ তা'আলার জন্যেই নির্ধারিত। তিনি ছাড়া আর কারও এ নাম হতে পারে না। যেমন আল্লাহ তাআলার নির্দেশ রয়েছেঃ “আল্লাহকে ডাকো বা রাহমানকে ডাকো, যে নামেই চাও তাঁকে ডাকতে থাকো। তার অনেক ভাল ভাল নাম রয়েছে। অন্য একটি আয়াতে আছেঃ وَ سْـئَـلْ مَنْ اَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رُّسُلِنَاۤ اَجَعَلْنَا مِنْ دُوْنِ الرَّحْمٰنِ اٰلِهَةً یُّعْبَدُوْنَ
অর্থাৎ তোমার পূর্ববর্তী নবীগণকে জিজ্ঞেস কর যে, রাহমান ছাড়া তাদের কোন মাবুদ ছিল কি যার তারা ইবাদত করতো?' (৪৩:৪৫) মুসাইলামা কায্যাব যখন নবুওয়াতের দাবী করে এবং নিজেকে রাহমানুল ইয়ামামা' নামে অভিহিত করে, আল্লাহ তা'আলা তখন তাকে অত্যন্ত লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত করেন এবং চরম মিথ্যাবাদী নামে সে সারা দেশে সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। আজও তাকে মুসাইলামা কায্যাব বলা হয় এবং প্রত্যেক মিথ্যা দাবীদারকে তার সাথে তুলনা করা হয়। আজ প্রত্যেক পল্লীবাসী ও শহরবাসী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত আবালবৃদ্ধ সবাই তাকে বিলক্ষণ চেনে।
কেউ কেউ বলেন যে, রাহমানের চেয়ে রাহীমের মধ্যেই বেশী مُبَالَغَة রয়েছে। কেননা, এ শব্দের সঙ্গে পূর্ব শব্দের تَاكِيْد করা হয়েছে, আর যার تَاكِيْد করা হয় তা অপেক্ষা تَاكِيْد ই বেশী জোরদার হয়ে থাকে। এর উত্তর এই যে, এখানে تَاكِيْد -ই হয়নি, বরং এতো صِفَت এবং صِفَت এর মধ্যে এ নিয়ম প্রযোজ্য নয়। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার এমন নাম নেয়া হয়েছে যে নামের মধ্যে তাঁর কোন অংশীদার নেই এবং রাহমানকেই সর্বপ্রথম ওর বিশেষণ রূপে বর্ণনা করা হয়েছে, সুতরাং এ নাম রাখাও অন্যের জন্যে নিষিদ্ধ। যেমন আল্লাহ পাক স্বয়ং বলেছেনঃ “তোমরা আল্লাহকে ডাক বা রাহমানকে ডাকো, যে নামেই চাও ডাকো, তার জন্যে বেশ ভাল ভাল সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে।
মুসাইলামা কাযযাব এ জঘন্যতম আস্পর্ধা দেখালেও সে সমূলে ধ্বংস হয়েছিল এবং তার ভ্রষ্ট সঙ্গীদের ছাড়া এটা অন্যের উপর চালু হয়নি। রাহীম বিশেষণটির সঙ্গে আল্লাহ তা'আলা অন্যদেরকেও বিশেষিত করেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ لَقَدْ جَآءَكُمْ رَسُوْلٌ مِّنْ اَنْفُسِكُمْ عَزِیْزٌ عَلَیْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِیْصٌ عَلَیْكُمْ بِالْمُؤْمِنِیْنَ رَءُوْفٌ رَّحِیْمٌ (৯:১২) এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবীকে (সঃ) رَحِيْمٌ বলেছেন। এভাবেই তিনি স্বীয় কতগুলি নাম দ্বারা অন্যদেরকেও স্মরণ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন (৭৬:২) اِنَّا خَلَقْنَا الْاِنْسَانَ مِنْ نُّطْفَةٍ اَمْشَاجٍ ﳓ نَّبْتَلِیْهِ فَجَعَلْنٰهُ سَمِیْعًۢا بَصِیْرًا
এখানে আল্লাহ তাআলা মানুষকে سَمِيْعٌ ও بَصِيْرٌ বলেছেন। মোটকথা এই যে, আল্লাহর কতগুলো নাম এমন রয়েছে যেগুলোর প্রয়োগ ও ব্যবহার অন্য অর্থে অন্যের উপরও হতে পারে এবং কতগুলো নাম আবার আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উপর ব্যবহৃত হতেই পারে না। যেমন আল্লাহ, রাহমান, খালেক এবং রাজ্জাক ইত্যাদি। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা প্রথম নাম নিয়েছেন আল্লাহ', অতঃপর ওর বিশেষণ রূপে রাহমান এনেছেন। কেননা রাহীমের তুলনায় এর বিশেষত্ব ও প্রসিদ্ধি অনেক গুণে বেশী। আল্লাহ সর্বপ্রথম তার সবচেয়ে বিশিষ্ট নাম নিয়েছেন, কেননা নিয়ম রয়েছে সর্বপ্রথম সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন নাম নেয়া। তারপরে তিনি অপেক্ষাকৃত কম পর্যায়ের ও নিম্ন মানের এবং তারও পরে তদপেক্ষা কমটা নিয়েছেন। এখন যদি প্রশ্ন করা হয় যে, রাহমানের মধ্যে যখন রাহীম অপেক্ষা مُبَالَغَة বেশী আছে, তখন তাকেই যথেষ্ট মনে করা হয়নি কেন? এর উত্তরে হযরত আতা’ খুরাসানীর (রঃ) এ কথাটি পেশ করা যেতে পারে যে, রহমান রাখতো সেই জন্যে রাহীম শব্দটিও আনা হয়েছে যাতে কোন সংশয়ের অবকাশ না থাকে। রাহমান ও রাহীম শুধু আল্লাহ তা'আলারই নাম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ), একথাটি নকল করেছেন। কেউ কেউ বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা قُلِ ادْعُوا اللّٰهَ اَوِ ادْعُوا الرَّحْمٰنَؕ-اَیًّا مَّا تَدْعُوْا فَلَهُ الْاَسْمَآءُ الْحُسْنٰىۚ (১৭:১১০) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করার পূর্বে কুরাইশ কাফিরেরা রাহমানের সঙ্গে পরিচিতিই ছিল না। এ আয়াত দ্বারা আল্লাহপাক তাদের ধারণা খণ্ডন করেন। হুদায়বিয়ার সন্ধির বছরেও রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আলী (রাঃ) কে বলেছিলেনঃ ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম লিখ।' কাফির কুরাইশরা তখন বলেছিল আমরা রাহমান ও রাহীমকে চিনি না। সহীহ বুখারীর মধ্যে এ বর্ণনাটি রয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, তারা বলেছিলঃ “আমরা ইয়ামামার রাহমানকে চিনি, অন্য কাউকেও চিনি না।' এভাবে কুরআন পাকের অন্যত্র রয়েছেঃ وَ اِذَا قِیْلَ لَهُمُ اسْجُدُوْا لِلرَّحْمٰنِ قَالُوْا وَ مَا الرَّحْمٰنُۗ-اَنَسْجُدُ لِمَا تَاْمُرُنَا وَ زَادَهُمْ نُفُوْرًا
অর্থাৎ যখন তাদেরকে বলা হয়-রাহমানের সামনে তোমরা সিজদাহ কর, তখন তারা আরও হিংস্র হয়ে উঠে এবং বলে-রাহমান কে যে আমরা তোমার কথা মতই তাকে সিজদা করবো?' (২৫:৬০) এ সবের সঠিক ভাব ও তাৎপর্য এই যে, এই দুষ্ট লোকগুলি অহঙ্কার ও শত্রুতার বশবর্তী হয়েই রাহমানকে অস্বীকার করতো, কিন্তু তারা যে রাহমানকে বুঝতে না বা তার সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিল তা নয়। কেননা অজ্ঞতা যুগের প্রাচীন কবিতাগুলোর মধ্যে আল্লাহর এই রাহমান নামটি দেখতে পাওয়া যায়। ওগুলো অজ্ঞতা যুগের ঐসব জাহেলী কবিরই কবিতা।
হযরত হাসান (রঃ) বলেনঃ রাহমান নামটি অন্যের জন্যে নিষিদ্ধ। ওটা স্বয়ং আল্লাহর নাম। এ নামের উপর লোকের কোন অধিকার নেই।' হযরত উম্মে সালমার (রাঃ) হাদীসটি পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক আয়াতে থামতেন এবং এভাবেই একটা দল বিসমিল্লাহির উপর আয়াত করে তাকে আলাদাভাবে পড়ে থাকেন। আবার কেউ কেউ মিলিয়েও পড়েন। দুইটি জযম একত্রিত হওয়ায় মীমে যের দিয়ে থাকেন। জমহুরের এটাই অভিমত। কোন কোন আরব মীমকে যবর দিয়ে পড়েন। তারা হামযার’ যবরটি ‘মীমকে দিয়ে থাকেন। যেমন- الٓمَّٓ ـ اللّٰهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ইবনে আতিয়্যাহ বলেনঃ “আমার জানা মতে যবরের কিরাআতটি কোন লোক থেকে বর্ণিত হয়নি।
(2) সাতজন কারীই اَلْحَمْدُ-এর دَال কে পেশ দিয়ে পড়ে থাকেন এবং اَلْحَمْدُ لِلَّهِ কে مُبْتَدَاء وَخَبَر বা উদ্দেশ্য ও বিধেয় বলে থাকেন। সুফইয়ান বিন উয়াইনা এবং রু’বাহ বিন আফ্যাজের মতে ‘দাল’ যবরের সঙ্গে হবে এবং এখানে ক্রিয়াপদ উহ্য রয়েছে। ইবনে আবী ইবলাহ اَلْحَمْدُ-এর দল কে ও لِلهِ-এর প্রথম ‘লাম’ এদুটোকেই পেশ দিয়ে পড়ে থাকেন এবং এ লামটিকে প্রথমটির تَابِع করে থাকেন। যদিও আরবদের ভাষায় এর প্রমাণ বিদ্যমান, তথাপি এটা সংখ্যায় অতি নগণ্য। হযরত হাসান (রঃ) এবং হযরত যায়েদ ইবনে আলী (রঃ) এই দুই অক্ষরকে যের দিয়ে পড়ে থাকেন এবং দাল’ কে ‘লামের' تَابِع করেন।
ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, اَلْحَمْدُ لِله-এর অর্থ এই যে, কৃতজ্ঞতা শুধু আল্লাহর জন্যে, তিনি ছাড়া আর কেউ এর যোগ্য নয়, সে সৃষ্ট জীবের মধ্যে যে কেউ হোক না কেন। কেননা, সমুদয় দান যা আমরা গণনা করতে পারি না এবং তার মালিক ছাড়া কারও সেই সংখ্যা জানা নেই, সবই তার কাছ থেকেই আগত। তিনিই তার আনুগত্যের সমুদয় মালমসলা আমাদেরকে দান করেছেন। আমরা যেন তাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলতে পারি সেজন্যে তিনি আমাদেরকে শারীরিক সমুদয় নিয়ামত দান করেছেন। অতঃপর ইহলৌকিক অসংখ্য নিয়ামত এবং জীবনের সমস্ত প্রয়োজন আমাদের অধিকার ছাড়াই তিনি আমাদের নিকট না চাইতেই পৌছিয়ে দিয়েছেন। তার সদা বিরাজমান অনুকম্পা এবং তার প্রস্তুতকৃত পবিত্র সুখের স্থান, সেই অবিনশ্বর জান্নাত আমরা কিভাবে লাভ করতে পারি তাও তিনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন। সুতরাং আমরা এখন নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, এসবের যিনি মালিক, প্রথম ও শেষ সমুদয় কৃতজ্ঞতা একমাত্র তাঁরই ন্যায্য প্রাপ্য। এটা একটা প্রশংসামূলক বাক্য। আল্লাহ পাক নিজের প্রশংসা নিজেই করেছেন এবং ঐ প্রসঙ্গেই তিনি যেন বলে দিলেনঃ তোমরা বল اَلْحَمْدُ لِله
অর্থাৎ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্যে।' কেউ কেউ বলেন যে, আলহামদু লিল্লাহ' বলে আল্লাহ তা'আলার পবিত্র নাম ও বড় বড় গুণাবলীর দ্বারা তার প্রশংসা করা হয়। আর اَلشُّكْرُ لِلهِ বলে তার দান ও অনুগ্রহের জন্যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু একথাটি সঠিক নয়। কেননা আরবী ভাষায় যারা পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন তারা এ বিষয়ে এক মত যে, شُكْر-এর স্থলে حَمْد ও حَمْد-এর স্থলে- شُكْر ব্যবহৃত হয়ে থাকে। জাফর সাদিক এবং ইবনে আতা' প্রমুখ সুফীগণ এটাই বলে থাকেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, প্রত্যেক কৃতজ্ঞের কৃতজ্ঞতা প্রকাশক কথা হলো اَلْحَمْدُ لِلهِ, কুরতুবী (রঃ) ইবনে জারীরের (রঃ) কথাকে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ করার জন্যে এ দলীল বর্ণনা করেছেন যে, যদি কেউ اَلْحَمْدُ لِلهِ شُكْرًا বলে তবে ওটাও নির্ভুল হবে। প্রকৃতপক্ষে আল্লামা ইবনে জারীরের কথায় পূর্ণ সমালোচনা ও পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে। পরবর্তী যুগের আলেমদের মধ্যে এটা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, প্রশংসিত ব্যক্তির প্রত্যক্ষ গুণাবলীর জন্য বা পরোক্ষ গুণাবলীর জন্য মুখে তার প্রশংসা করার নাম হামদ। আর শুধুমাত্র পরোক্ষ গুণাবলীর জন্যে তার প্রশংসা করার নাম শুকর এবং তা অন্তঃকরণ, জিহ্বা এবং কাজের দ্বারাও করা হয়। আরব কবিদের কবিতাও এর সাক্ষ্য ও দলীলরূপে পেশ করা যেতে পারে। তবে حَمْد শব্দটি عَام কি شُكْر শব্দটি عَام এ বিষয়ে কিছুটা মতভেদ বিদ্যমান রয়েছে। সঠিক ও অভ্রান্ত কথা এই যে, ওদের মধ্যে عُمُوْم ও خُصُوْص-এর সম্পর্ক রয়েছে। এক দিক দিয়ে حَمْد শব্দটি شُكْر শব্দ হতে عَام কেননা এটা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় গুণের সাথেই সমভাবে সম্পর্কিত ও সংযুক্ত। পবিত্রতা ও দান উভয়ের জন্যেই حَمَدْتُّهٗ বলা চলে। আবার শুধু জিহ্বা দিয়ে তা আদায় করা হয় বলে এটা خَاص এবং شُكْر শব্দটি হচ্ছে عَام, কেননা ওটা কথা কাজ ও অন্তঃকরণ -এ তিনটার উপরেই সমানভাবে বলা হয়। আবার পরোক্ষ গুণের উপর বলা হয় বলে شُكْر শব্দটি خَاص পবিত্রতার উপর شَكَرْتُهٗ বলা হয় না বরং شَكَرْتُهٗ عَلٰى كَرَمِهٖ وَاِحْسَانِهٖ اِلٰى একথা বলা যেতে পারে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন।
আবু নসর ইসমাইল বিন হাম্মাদ জওহারী (রঃ) বলেন যে, حَمْد অর্থাৎ প্রশংসা শব্দটি ذَم অর্থাৎ তিরস্কারের উল্টা। বলা হয়- حَمَدْتُّ الرَّجُلَ اَحْمَدُهٗ وَمَحْمَدَةً فَهُوَ حَمِيْدٌ وَمَحْمُوْدٌ
تَحْمِيْد-এর মধ্যে حَمْد-এর চেয়েও বেশী مُبَالَغَه বা আধিক্য রয়েছে حَمْد শব্দটি شُكْر শব্দ হতে عَام, দাতার দানের উপর তার প্রশংসা করাকে আরবী ভাষায় شُكْر বলা হয়। شُكِرْتُهٗ এবং شَكَرْتُ لَهٗ এ দু’ভাবেই প্রয়োগ করা চলে। কিন্তু লামের সঙ্গে বলাই বেশী সমীচীন ও শোভনীয়। مَدْح শব্দটি حَمْد হতেও বেশী عَام, কেননা জীবিত ও মৃত এমনকি জড় পদার্থের উপরেও مَدْح শব্দটি ব্যবহৃত হয়। অনুগ্রহের পূর্বে ও পরে, প্রত্যক্ষ গুণাবলীর উপর ও পরোক্ষ গুণাবলীর উপর তার ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে বলেই ওর عَام হওয়া সাব্যস্ত হলো। অবশ্য এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
حَمْدٌ ‘হামদ’ শব্দের তাফসীর ও পূর্বযুগীয় গুরুজনদের অভিমত
হযরত উমার (রাঃ) একবার বলেছিলেনঃ سُبْحَانَ اللهِ ও لَااِلٰهَ اِلَّااللهُ এবং কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, اَللهُ اَكْبَرُ কে আমরা জানি, কিন্তু اَلْحَمْدُ لِلهِ এর ভাবার্থ কি? হযরত আলী (রাঃ), উত্তরে বললেনঃ আল্লাহ তাআলা এ কথাটিকে নিজের জন্যে পছন্দ করেছেন এবং কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, এটা বললে আল্লাহকে খুবই ভাল লাগে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “এটা কৃতজ্ঞতা প্রকাশক বাক্য। এর উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার বান্দা আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। সুতরাং এই কথাটির মধ্যে শুকর ছাড়া আল্লাহর দানসমূহ, হেদায়াত, অনুগ্রহ প্রভৃতির স্বীকারোক্তি রয়েছে। হযরত কা'ব আহ্বারের (রাঃ) অভিমত এই যে, একথাটি আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা। হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, এটা আল্লাহ পাকের চাদর। একটা হাদীসে একথাও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা اَلْحَمْدُ لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ বললেই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়ে যাবে। এখন তিনি তোমাদের উপর বরকত দান করবেন।
হযরত আসওয়াদ বিন সারী’ (রাঃ) একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে আরয করেনঃ “আমি মহান আল্লাহর প্রশংসার কয়েকটি কবিতা রচনা করেছি। অনুমতি পেলে শুনিয়ে দেবো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলা নিজের প্রশংসা শুনতে পছন্দ করেন। মুসনাদ-ই-আহমাদ, সুনান-ই নাসায়ী, জামেউত তিরমিযী এবং সুনান-ই-ইবনে মাজাহয় হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ সর্বোত্তম যিকর হচ্ছে لَااِلٰهَ اِلَّااللهُ এবং সর্বোত্তম প্রার্থনা হচ্ছে اَلْحَمْدُ لِلهِ, ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে পরিভাষা অনুযায়ী হাসান গারীব' বলে থাকেন।
সুনান-ই-ইবনে মাজাহয় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাঁর বান্দাকে কিছু দান করার পর যদি সে তার জন্যে আলহামদুল্লিাহ' পাঠ করে তবে তার প্রদত্ত বস্তুই গৃহীত বস্তু হতে উত্তম হবে। আল্লাহর রাসূল (সঃ) আরও বলেনঃ “যদি আল্লাহ আমার উম্মতের মধ্যে কোন লোককে দুনিয়া দান করেন এবং সে যদি তার জন্য আলহামদুল্লিাহ' পাঠ করে তবে এ কথাটি সমস্ত দুনিয়া জাহান হতে উত্তম হবে।' কুরতুবী (রঃ) বলেনঃ
এর ভাবার্থ এই যে, আল হামদুলিল্লাহ' বলার তাওফীক লাভ যত বড় নিয়ামত, সারা দুনিয়া জাহান দান করাও ততো বড় নিয়ামত নয়। কেননা দুনিয়া তো নশ্বর ও ধ্বংসশীল, কিন্তু একথার পুণ্য অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী। যেমন পবিত্র কুরআনের মধ্যে রয়েছেঃ اَلْمَالُ وَ الْبَنُوْنَ زِیْنَةُ الْحَیٰوةِ الدُّنْیَاۚ-وَ الْبٰقِیٰتُ الصّٰلِحٰتُ خَیْرٌ عِنْدَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَّ خَیْرٌ اَمَلًا
অর্থাৎ “ধনদৌলত ও সন্তান সন্ততি দুনিয়ার সৌন্দর্য মাত্র, কিন্তু সত্যার্যাবলী চিরস্থায়ী পুণ্য বিশিষ্ট এবং উত্তম আশাবাহক।' (১৮:৪৬) সুনান-ই-ইবনে মাজাহর মধ্যে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ একদা এক ব্যক্তি এই দু'আ পাঠ করলোঃ يَارَبِّ لَكَ الْحَمْدُ كَمَا يَنْبَغِىْ لِجَلَالِ وَجْهِكَ وَقَدِيْمِ سُلْطَانِكَ
এতে ফেরেশতাগণ পুণ্য লিখার ব্যাপারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। অবশেষে তারা আল্লাহ পাকের নিকট আরয করলেনঃ আপনার এক বান্দা এমন একটা কালেমা পাঠ করেছে যার পুণ্য আমরা কি লিখবো বুঝতে পারছি না। বিশ্ব প্রভু সব কিছু জানা সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করলেনঃ “সে কী কথা বলেছে?' তাঁরা বললেন যে, সে এই কালেমা বলেছে। তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “সে যা বলেছে তোমরা হুবহু তাই লিখে নাও। আমি তার সাথে সাক্ষাতের সময়ে নিজেই তার যোগ্য প্রতিদান দেবো।'
কুরতুবী (রঃ) আলেমদের একটি দল হতে নকল করেছেন যে, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু' হতেও আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ উত্তম। কেননা, এর মধ্যে অহূদানিয়্যাত বা একত্ববাদ ও, প্রশংসা দুটোই রয়েছে। কিন্তু অন্যান্য আলেমগণের ধারণা এই যে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ই উত্তম। কেননা ঈমান ও কুফরের মধ্যে এটাই পার্থক্যের সীমারেখা টেনে দেয়। আর এটা বলাবার জন্যই কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করা হয়, যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে। আরও একটি মারফু হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণ যা কিছু বলেছি তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু অহ্দাহু লা শারীকালাহু।”
হযরত জাবিরের (রাঃ) একটি মারফু হাদীস ইতিপূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, সর্বোত্তম যিক্র হলো ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ এবং সর্বোত্তম প্রার্থনা হলো আল হামদু লিল্লাহ'। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ‘আল হামদু’র আলিফ লাম ইসতিগরাকের জন্যে ব্যবহৃত অর্থাৎ সমস্ত প্রকারের হামদ' বা স্ততিবাদ একমাত্র আল্লাহর জন্যেই সাব্যস্ত। যেমন হাদীসে রয়েছেঃ “হে আল্লাহ! সমুদয় প্রশংসা তোমারই জন্যে, সারা দেশ তোমারই, তোমারই হাতে সামগ্রিক মঙ্গল নিহিত রয়েছে এবং সমস্ত কিছু তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করে থাকে।
সর্বময় কর্তাকে রব' বলা হয় এবং এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে নেতা এবং সঠিকভাবে সজ্জিত ও সংশোধনকারী। এসব অর্থ হিসেবে আল্লাহ তা'আলার জন্যে এ পবিত্র নামটিই শোভনীয় হয়েছে। রব’ শব্দটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্যে ব্যবহৃত হতে পারে না। তবে সম্বৰূপদরূপে ব্যবহৃত হলে সে অন্য কথা। যেমন رَبُّ الدَّرِ বা গৃহস্বামী ইত্যাদি। কারো কারো মতে এটাই ইসমে আযম। عَالَمِيْنَ শব্দটি عَالَمٌ শব্দের বহু বচন। আল্লাহ ছাড়া সমুদয় সৃষ্টবস্তুকে عَالَم বলা হয়। عَالَم শব্দটিও বহু বচন এবং এ শব্দের এক বচনই হয় না। আকাশের সৃষ্টজীব এবং জল ও স্থলের সৃষ্টজীবকেও عَوَالِم অর্থাৎ কয়েকটি عَالَم বলা হয়। অনুরূপভাবে এক একটি যুগ-কাল ও এক একটি সময়কেও عَالَم বলা হয়।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে যে, এর দ্বারা সমুদয় সৃষ্টজীবকেই বুঝায়, নভোমণ্ডলেরই হোক বা ভূমণ্ডলের হোক অথবা এ দুয়ের মধ্যবর্তী জায়গারই হোক এবং তা আমাদের জানাই হোক বা অজানাই থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতেই এর ভাবার্থরূপে দানব ও মানব বর্ণিত হয়েছে। হযরত সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ) এবং ইবনে জুরাইজ (রঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে কিন্তু সনদ হিসেবে এটা নির্ভরযোগ্য নয়। একথার দলীলরূপে কুরআন পাকের এ আয়াতটিও বর্ণনা করা হয়েছেঃ لِيَكُوْنَ لِلْعَالَمِيْنَ نَذِيْرًا অর্থাৎ ‘যেন তিনি আলামীনের জন্যে অর্থাৎ দানব ও মানবের জন্যে ভয় প্রদর্শক হয়ে যান।' ফারা (রঃ) ও আবু উবায়দার (রঃ) মতে প্রতিটি বিবেকসম্পন্ন প্রাণীকে ‘আলাম বলা হয়। দানব, মানব ও শয়তানকে ‘আলাম বলা হবে। জন্তুকে ‘আলাম বলা হবে না। হযরত যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) এবং হযরত আবু মাহীসেন (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক প্রাণীকেই ‘আলাম বলা হয়। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক শ্রেণীকে একটা আলাম বলা হয়।
ইবনে মারওয়ান বিন হাকাম উরফে জা’দ, যার উপাধি ছিল হিমার, যিনি বানূ উমাইয়াদের আমলে একজন খলীফা ছিলেন, তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা সতেরো হাজার ‘আলম সৃষ্টি করেছেন। আকাশে অবস্থিত সবগুলো একটা ‘আলম, যমীনে অবস্থিত সবগুলো একটা আলম এবং বাকীগুলো আল্লাহ তা'আলাই জানেন। মানুষের নিকট ওগুলো অজ্ঞাত।' আবুল ‘আলিয়া (রঃ) বলেন যে, সমস্ত মানুষ একটা ‘আলম, সমস্ত জ্বিন একটা ‘আলম, এবং এ দুটো ছাড়া আরো আঠারো হাজার বা চৌদ্দ হাজার ‘আলম রয়েছে। ফেরেশতাগণ যমীনের উপর আছেন। যমীনের চারটি প্রান্ত রয়েছে এবং প্রত্যেক প্রান্তে সাড়ে তিন হাজার ‘আলম রয়েছে। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা শুধুমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এ বর্ণনাটি সম্পূর্ণ গারীব বা অপরিচিত। এ ধরনের কথা যে পর্যন্ত না সহীহ দলীল ও অকাট্য প্রমাণ দ্বারা সাব্যস্ত হয়, আদৌ মানবার যোগ্য নয়। রাব্বল আলামীন’র ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে হুমাইরী (রঃ) বলেন যে, বিশ্বজাহানে এক হাজার জাতি রয়েছে। ছয়শো আছে জলে, আর চারশো আছে স্থলে। সাঈদ বিন মুসাইয়্যেব (রঃ) হতেও এটা বর্ণিত হয়েছে।
একটা দুর্বল বর্ণনায় আছে যে, হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) খিলাফত কালে এক বছর ফড়িং দেখা যায়নি। এমনকি অনুসন্ধান করেও এর কোন পাত্তা মিলেনি। তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন এবং সিরিয়া ও ইরাকে অশ্বারোহী পাঠিয়ে দিলেন এজন্য যে, কোনও স্থানে ফড়িং দেখা যায় কিনা। ইয়ামন যাত্রী অল্প বিস্তর ফড়িং ধরে এনে আমীরুল মুমেনীনের সামনে হাযির করলেন। তিনি তা দেখে তাকবীর ধ্বনি করলেন এবং বললেন আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতে শুনেছিঃ “আল্লাহ তা'আলা এক হাজার জাতি সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্য ছয়শো পানিতে, চারশো স্থলে। তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম যে জাতি ধ্বংস হবে তা হবে ফড়িং। অতঃপর ক্রমাগত সব জাতিই একে একে ধ্বংস হয়ে যাবে যেমনভাবে তসবীহের সূতা কেটে গেলে দানাগুলি ক্রমাগত ঝরে পড়ে। কিন্তু এ হাদীসের রাবী বা বর্ণনাকারী মুহাম্মদ বিন ঈসা হিলালী দুর্বল। হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়্যেব (রঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে।
ওয়াহিব বিন মামবাহ বলেন যে, আঠারো হাজার ‘আলামের মধ্যে সারা। দুনিয়া একটি ‘আলম। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, চল্লিশ হাজার ‘আলামের মধ্যে সারা দুনিয়া একটা ‘আলম। যাযাজ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা ইহজগত ও পরজগতে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন সবই ‘আলম। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, এ মতটিই সত্য। কেননা এর মধ্যে সমস্ত ‘আলমই জড়িত রয়েছে। যেমন ফিরআউনের বিশ্বপ্রভু কৈ' এই প্রশ্নের উত্তরে হযরত মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ ‘আসমান, যমীন এবং এ দুয়ের মধ্যে স্থলে যা কিছু আছে সবারই তিনি প্রভূ।'
عَالَم শব্দটি عَلَامَت শব্দ হতে নেওয়া হয়েছে। কেননা, আলম সৃষ্ট বস্তু তার সৃষ্টিকারীর অস্তিত্বের পরিচয় বহন করে এবং তাঁর একত্ববাদের চিহ্নরূপে কাজ করে থাকে। যেমন কবি ইবনে মুতায এর কথাঃ فَيَاعَجَبًا كَيْفَ يَعْصِى الْاِلٰهَ ـ اَمْ كَيْفَ يَجْحَدُهُ الْجَاحِدُ ـ وَفِىْ كُلِّ شَىْءٍ لَهٗ اٰيَةٌ ـ تَدُلُّ عَلٰى اَنَّهٗ وَاحِدٌ
অর্থাৎ আল্লাহর অবাধ্য হওয়া বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে, এবং এটাও বিস্ময়জনক যে, কিভাবে অস্বীকারকারী তাকে অস্বীকার করছে। অথচ প্রতিটি জিনিসের মধ্যেই এমন স্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে যা প্রকাশ্যভাবে তার একত্ববাদের পরিচয় বহন করছে।
(3) এর তাফসীর পূর্বেই করা হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তির আর কোন প্রয়োজন নেই। কুরতুবী (রঃ) বলেন যে, মহান আল্লাহ رب العالمين-এর বিশেষণের পর الرحمن الرحيم নামক বিশেষণটি ভয় প্রদর্শনের পর আশা ভরসার উদ্রেক কল্পে আনয়ন করেছেন। যেমন তিনি অন্যত্র বলেছেনঃ نَبِّئْ عِبَادِىٓ أَنِّىٓ أَنَا ٱلْغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ - وَأَنَّ عَذَابِى هُوَ ٱلْعَذَابُ ٱلْأَلِيمُ
অর্থাৎ আমার বান্দাগণকে সংবাদ দাও যে, আমি ক্ষমতাশালী ও দয়ালু এবং আমার শাস্তিও বেদনাদায়ক। (১৫:৪৯-৫০) তিনি আরও বলেছেনঃ “তোমার প্রভু সত্বরই শাস্তি প্রদানকারী এবং তিনি দয়ালু ও ক্ষমাশীলও বটে।
রব’ শব্দটির মধ্যে ভয় প্রদর্শন রয়েছে এবং রাহমান’ ও ‘রাহীম' শব্দ দুইটির মধ্যে আশা ভরসা রয়েছে। সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যদি ঈমানদারগণ আল্লাহর ক্রোধ এবং তার ভীষণ শাস্তি সম্পর্কে পূর্ণভাবে অবহিত হতো তবে তাদের অন্তর হতে বেহেশতের নন্দন কাননের লোভ লালসা সরে যেতো এবং কাফিরেরা যদি আল্লাহ তা'আলার দান ও দয়া দাক্ষিণ্য সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞান রাখতে তবে তারা কখনও নিরাশ ও হতাশাগ্রস্ত হতো না।'
(4) কারীদের কেউ কেউ একে مَالِك পড়েছেন এবং অন্যান্য সবাই مُلْكِ পড়েছেন। এই দুই পঠনই বিশুদ্ধ, মুতাওয়াতির এবং অনুমোদিত সাতটি কিরাআতের অন্তর্গত। مَالِك এর لَام কে যেরের সঙ্গে যমের সঙ্গে এবং مَلِيْك ও مُلْكِىْ ও পড়া হয়েছে। প্রথম পঠন দুইটি অর্থ হিসেবে অগ্রগণ্য এবং দুটোই শুদ্ধতর ও উত্তম। ইমাম যামাখশারী (রঃ) مُلْكِ কেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কেননা, মক্কা ও মদীনাবাসীদের কিরআত এটাই। তাছাড়া কুরআন মাজীদের মধ্যে لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ এবং قَوْلُهُ الْحَقُّ وَلَهُ الْمُلْكُ রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) হতেও নকল করা হয়েছে যে, তিনি فِعْل، فَاعِل এবং مَفْعُوْل-এর উপর ভিত্তি করে مُلْكِ পড়েছেন। কিন্তু এটা শাজ-বিরল এবং অত্যন্ত গারীব। আবু বকর বিন আবি দাউদ (রঃ) এতে আরও একটি গারীব বর্ণনা পেশ করেছেন, তা হচ্ছে এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর তিনজন খলীফা (রাঃ), হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এবং তাঁর ছেলে مَالِك পড়তেন। ইবনে শিহাব বলেন যে, সর্বপ্রথম মারওয়ান مُلْكِ পড়েছিলেন। কিন্তু আমাদের ধারণা এই যে, এ কিরআতের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে মারওয়ানের সম্যক অবগতি ছিল, যা স্বয়ং বর্ণনাকারী শিহাবের ছিল না। আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন।
ইবনে মিরদুওয়াই কয়েকটা সনদের সঙ্গে এটা বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) مَالِكِ পড়তেন। مَالِكِ শব্দটি مِلْكٌ শব্দ হতে নেয়া হয়েছে। যেমন কুরআন পাকে রয়েছেঃ اِنَّا نَحْنُ نَرِثُ الْاَرْضَ وَ مَنْ عَلَیْهَا وَ اِلَیْنَا یُرْجَعُوْنَ অর্থৎ “নিশ্চয়ই পৃথিবী ও তার উপরিভাগের সমুদয় সৃষ্ট বস্তুর মালিক আমিই এবং আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” (১৯:৪০) তিনি আরও বলেছেনঃ قُلْ اَعُوْذُ بِرَبِّ النَّاسِ ـ مَلِكِ النَّاسِ
অর্থাৎ “তুমি বল-আমি মানুষের প্রভুর নিকট ও মানুষের মালিকের নিকট আশ্রয় চাচ্ছি مَلِك শব্দটি مُلْك শব্দ হতে নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক কুরআন মাজীদে বলেছেনঃ لِمَنِ الْمُلْكُ الْیَوْمَؕ-لِلّٰهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ অর্থাৎ “আজ রাজ্য কার? শুধুমাত্র মহাশক্তিশালী এক আল্লাহরই।' (৪০:১৬) তিনি আরও বলেছেনঃ قَوْلَهُ الْحَقُّ وَلَهُ الْمُلْكُ অর্থাৎ তার কথাই সত্য এবং সমস্ত রাজ্য তারই? আর এক জায়গায় বলেছেনঃ اَلْمُلْكُ یَوْمَىٕذِ ﹰالْحَقُّ لِلرَّحْمٰنِؕ-وَ كَانَ یَوْمًا عَلَى الْكٰفِرِیْنَ عَسِیْرًا
অর্থাৎ “আজকে আল্লাহই রাজ্যের অধিকারী এবং আজকের দিন কাফিরদের জন্যে অত্যন্ত কঠিন দিন।' (২৫:২৬) মহান আল্লাহর এ উক্তি অনুসারের কিয়ামতের দিনের সঙ্গে তার অধিকারকে নির্দিষ্ট করার অর্থ এই নয় যে, কিয়ামত ছাড়া অন্যান্য জিনিসের অধিকারী হতে তিনি অস্বীকার করছেন, কেননা ইতিপূর্বে তিনি স্বীয় বিশেষণ রাব্বল আলামীন' রূপে বর্ণনা করেছেন এবং ওর মধ্যেই দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই জড়িত রয়েছে। কিয়ামতের দিনের সঙ্গে অধিকারকে নির্দিষ্টকরণের কারণ এই যে, সেই দিন তো আর কেউ সার্বিক অধিকারের দাবীদারই হবে না। বরং সেই প্রকৃত অধিকারী আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কেউ মুখ পর্যন্ত খুলতে পারবে না। এমনকি টু শব্দটিও করতে পারবে না। যেমন তিনি বলেছেনঃ یَوْمَ یَقُوْمُ الرُّوْحُ وَ الْمَلٰٓىٕكَةُ صَفًّا ﯼ لَّا یَتَكَلَّمُوْنَ اِلَّا مَنْ اَذِنَ لَهُ الرَّحْمٰنُ وَ قَالَ صَوَابًا
অর্থাৎ প্রাণী ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে, আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন সে ছাড়া আর কেউ কথা বলতে পারবে না এবং সে কথাও ঠিক ঠিক বলবে।' (৭৮:৩৮) অন্য এক জায়গায় ইরশাদ হচ্ছেঃ وَ خَشَعَتِ الْاَصْوَاتُ لِلرَّحْمٰنِ فَلَا تَسْمَعُ اِلَّا هَمْسًا
অর্থাৎ আল্লাহ রাহমানুর রাহীমের সামনে সমস্ত শব্দ নত হয়ে যাবে। এবং ক্ষীণকণ্ঠের গুন্ গুন্ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাবে না।' (২০:১০৮) তিনি আরও বলেছেনঃ یَوْمَ یَاْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ اِلَّا بِاِذْنِهٖۚ-فَمِنْهُمْ شَقِیٌّ وَّ سَعِیْدٌ অর্থাৎ ‘কিয়ামত আসবে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ কথা বলতে বা মুখ খুলতে পারবে না, তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগ্য এবং কেউ হবে ভাগ্যবান। (১১:১০৫)।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘সেদিন তার রাজত্বে তিনি ছাড়া আর কেউই থাকবে না, যেমন দুনিয়ার বুকে রূপক অর্থে ছিল।' يَوْمِ الدِّيْنِ-এর ভাবার্থ হচ্ছে সমগ্র সষ্ট জীবের হিসাব দেয়ার দিন অর্থাৎ কিয়ামতের দিন, যেদিন সমস্ত ভাল-মন্দ কাজের ন্যায্য ও চুলচেরা প্রতিদান দেয়া হবে। হ্যা, তবে যদি মহান আল্লাহ কোন কাজ নিজ গুণে মার্জনা করেন তবে তা হবে তার ইচ্ছা ভিত্তিক কাজ। সাহাবা (রাঃ), তাবেঈন (রঃ) এবং পূর্ব যুগীয় সৎ ব্যক্তিগণ হতেও এটা বর্ণিত হয়েছে। কোন কোন ব্যক্তি হতে এ কথাও বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে। আল্লাহ কিয়ামত ঘটাতে সক্ষম। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এ কথাটাকে দুর্বল বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু বাহ্যতঃ এ দুটো কথার মধ্যে কোন বিরোধ নাই, প্রত্যেক কথার কথক অপরের কথার সত্যতা প্রমাণ করছে। তবে প্রথম কথাটি ভাবার্থের জন্যে বেশী প্রামাণ্য। যেমন আল্লাহ পাকের ঘোষণা রয়েছেঃ اَلْمُلْكُ یَوْمَىٕذِ ﹰالْحَقُّ لِلرَّحْمٰنِؕ-وَ كَانَ یَوْمًا عَلَى الْكٰفِرِیْنَ عَسِیْرًا এবং দ্বিতীয় কথাটি নিম্নের এ আয়াতের অনুরূপঃ
وَيَوْمَ يَقُولُ كُنْ فَيَكُوْنُ অর্থাৎ যেদিন তিনি বলবেন হও’ তখনই হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। কেননা মহান আল্লাহই সব কিছুরই প্রকৃত মালিক। যেমন তিনি বলেছেনঃ هُوَ اللّٰهُ الَّذِىْ لَااِلٰهَ اِلَّاهُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوْسُ السَّلَامُ
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইয়রা (রাঃ) হতে এই মারফু হাদীসটি বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তির নাম আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যন্ত জঘন্য, ও নিকৃষ্ট যাকে শাহান শাহ বা রাজাধিরাজ বলতে হয়। কারণ সব কিছুরই প্রকৃত মালিক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। উক্ত সহীহ হাদীস গ্রন্থদ্বয়ের মধ্যে এসেছে যে, আল্লাহ পাক সেদিন সমগ্র যমীনকে স্বীয় মুষ্ঠির মধ্যে গ্রহণ করবেন এবং আকাশ তার দক্ষিণ হস্তে ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ হয়ে জড়িয়ে থাকবে, অতঃপর তিনি বলবেনঃ ‘আমি আজ প্রকৃত বাদশাহ, যমীনের সেই প্রতাপশালী বাদশাহরা কোথায় গেল? কোথায় রয়েছে। সেই মদমত্ত অহংকারীগণ? কুরআন কারীমে আরও রয়েছেঃ لَمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ لِلّٰهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ
অর্থাৎ আজ রাজত্ব কার? শুধুমাত্র মহাপরাক্রান্ত এক আল্লাহরই'। অন্যকে তাই শুধু রূপক অর্থে মালিক বলা হয়েছে। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ اِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ لَكُمْ طَالُوْتَ مَلِكَا
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা নিশ্চয় তালুতকে তোমাদের জন্যে মালিক বা বাদশাহ করে পাঠিয়েছেন।' (২:২৪৭) এখানে তালুতকে মালিক বলা হয়েছে। অনুরূপভাবে وَكَانَ وَرَاءَهُمْ مَلِكٌ এই শব্দও এসেছে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে مُلُوْكٌ শব্দ এসেছে এবং কুরআন মাজীদের একটি আয়াতে আছেঃ اِذْ جَعَلَ فِیْكُمْ اَنْۢبِیَآءَ وَ جَعَلَكُمْ مُّلُوْكًا
অর্থাৎ তিনি তোমাদের মধ্যে নবী করেছেন এবং তোমাদেরকে বাদশাহ বানিয়েছেন।' (৫:২০) সহীহ বুখারী ও মুসলিমে একটি হাদীসে আছেঃ مَثَلُ الْمُلُوْكِ عَلَى الْاُسْرَةِ অর্থাৎ ‘সিংহাসনে অধিষ্ঠিত বাদশাহদের ন্যায়।' دِيْن শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রতিদান, প্রতিফল এবং হিসাব নিকাশ। যেমন আল্লাহ তা'আলা কুরআন পাকের মধ্যে বলেছেনঃ یَوْمَىٕذٍ یُّوَفِّیْهِمُ اللّٰهُ دِیْنَهُمُ الْحَقَّ
অর্থাৎ ‘সেদিন আল্লাহ তাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান দেবেন।' (২৪:২৫) পবিত্র কুরআনের অন্য জায়গায় আছেঃ اَئِنَّا لَمَدِيْنُوْنَ অর্থাৎ আমাদেরকে কি প্রতিদান দেয়া হবে' হাদীসে আছেঃ পণ্ডিত সেই ব্যক্তি যে নিজেই নিজের কাছে প্রতিদান নেয় এবং এমন কার্যাবলী সম্পাদন করে যা অবধারিত মৃত্যুর পরে কাজে লাগে।' অর্থাৎ নিজের আত্মার কাছে নিজেই হিসাব নিকাশ নিয়ে থাকে। যেমন হযরত ফারুকে আযম (রাঃ) বলেছেনঃ তোমাদের হিসাব নিকাশ গৃহীত হওয়ার পূর্বে তোমরা নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ কর এবং তোমাদের কার্যাবলী দাড়ি পাল্লায় ওজন হওয়ার পূর্বে তোমরা নিজেরাই ওজন কর এবং তোমরা আল্লাহর সামনে উপস্থাপিত হওয়ার পূর্বে সেই বড় উপস্থিতির জন্যে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ কর যেদিন তোমাদের কোন কাজ গোপন থাকবে না। যেমন স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ یَوْمَىٕذٍ تُعْرَضُوْنَ لَا تَخْفٰى مِنْكُمْ خَافِیَةٌ অর্থাৎ যেদিন তোমাদেরকে হাযির করা হবে সেদিন তোমাদের কোন কথা আল্লাহর নিকট গোপন থাকবে না।' (৬৯:১৮)
(5) সাতজন কারী এবং জমহুর একে اِيَّاكَ (ঈয়্যাকা) পড়েছেন। আমর বিন সাঈদ তাশদীদ ছাড়া একে হালকা করে اِيَاكَ (ইয়্যাকা) পড়েছেন। কিন্তু এ কিরাআত বিরল ও পরিত্যাজ্য। কেননা اِيَّا ইয়্যা-এর অর্থ হচ্ছে সূর্যের আলো। আবার কেউ কেউ اَيَاكَ (আয়াকা) আবার কেউ কেউ هَيَّاكَ (হাইয়্যাকা) ও পড়েছেন। আরব কবিদের কবিতায়ও هَيَّاكَ (হাইয়্যাকা) আছে। যেমন- فَهَيَّاكَ وَالْاَمْرُ الَّذِىْ اِنْ تَدَاحَبَتْ ـ مَوَادِرُهٗ ضَاقَتْ عَلَيْكَ مَصَادِرُهٗ
ইয়াহইয়া বিন অসাব ও আমাশ ছাড়া সকল কারীর কাছেই نَسْتَعِيْنُ-এর পঠন নূনের যবরের সঙ্গে। কিন্তু এঁরা দু'জন প্রথম নূনটিকে যের দিয়ে পড়ে থাকেন। বানূ আসাদ, রাবীআ' এবং বানূ তামীম গোত্রের লোকেরাও এরকমই পড়ে থাকেন। ইবাদত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সার্বিক অপমান ও নীচতা। তারীকে মোয়াববাদ’ সাধারণ ঐ পথকে বলে যা সবচেয়ে হীন ও নিকৃষ্ট হয়ে থাকে। এ রকমই بَعِيْرٌ مُعَبَّدٌ ঐ উটকে বলা হয় যা হীনতা ও দুর্বলতার চরম সীমায় পদার্পণ করে। শরীয়তের পরিভাষায় প্রেম, বিনয়, নম্রতা এবং ভীতির সমষ্টির নাম ‘ইবাদত'। اِيَّاكَ শব্দটি مَفْعُوْل , একে পূর্বে আনা হয়েছে, অতঃপর তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যাতে তার গুরুত্ব বেড়ে যায় এবং সাহায্য প্রার্থনার জন্যে যেন একমাত্র আল্লাহই বিশিষ্ট হয়ে যান। তা হলে বাক্যটির অর্থ এ দাঁড়ায়ঃ আমরা আপনার ছাড়া আর কারো ইবাদত করি না এবং আপনার ছাড়া আর কারো উপর নির্ভর করি না। আর এটাই হচ্ছে পূর্ণ আনুগত্য ও বিশ্বাস। সালাফে সালেহীন বা পূর্বযুগীয় প্রবীণ ও বয়োবৃদ্ধ গুরুজনদের কেউ কেউ এ মত পোষণ করেন যে, সম্পূর্ণ কুরআনের গোপন তথ্য রয়েছে সূরা ফাতিহার মধ্যে এবং এ পূর্ণ সূরাটির গোপন তথ্য রয়েছে اِیَّاكَ نَعْبُدُ وَ اِیَّاكَ نَسْتَعِیْنُ নামক এই আয়াতটির মধ্যে। আয়াতটির প্রথমাংশে রয়েছে শিরকের প্রতি অসন্তুষ্টি এবং দ্বিতীয়াংশে রয়েছে স্বীয় ক্ষমতার উপর অনাস্থা ও মহা শক্তিশালী আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা। এ সম্পর্কীয় আরও বহু আয়াত কুরআন পাকে বিদ্যমান রয়েছে। যেমন তিনি বলেছেনঃ فَاعْبُدْهُ وَ تَوَكَّلْ عَلَیْهِؕ-وَ مَا رَبُّكَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُوْنَ
অর্থাৎ তারই ইবাদ কর ও তারই উপর নির্ভর কর এবং (জেনে রেখ যে,) তোমরা যা করছে তা হতে তোমাদের প্রভু উদাসীন নন। (১১:১২৩) তিনি আরও বলেছেনঃ قُلْ هُوَ الرَّحْمٰنُ اٰمَنَّا بِهٖ وَ عَلَیْهِ تَوَكَّلْنَاۚ অর্থাৎ বলে দাও-তিনি রাহমান, আমরা তার উপর ঈমান এনেছি এবং তাঁরই উপর আমরা ভরসা করেছি।' (৬৭:২৯) আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ رَبُّ الْمَشْرِقِ وَ الْمَغْرِبِ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ فَاتَّخِذْهُ وَكِیْلًا অর্থাৎ পূর্ব ও পশ্চিমের প্রভু তিনিই, তিনি ছাড়া আর কেউ উপাস্য নেই, সুতরাং তাঁকেই একমাত্র কার্যসম্পাদনকারীরূপে গ্রহণ কর।' (৭৩:৯)
اِیَّاكَ نَعْبُدُ وَ اِیَّاكَ نَسْتَعِیْنُ এই আয়াত-ই-কারীমের মধ্যেও এই বিষয়টিই রয়েছে। পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে সম্মুখস্থ কাউকে লক্ষ্য করে সম্বোধন ছিল না। কিন্তু এ আয়াতটিতে আল্লাহ পাককে সম্বোধন করা হয়েছে এবং এতে বেশ সুন্দর পারস্পরিক সম্বন্ধ রয়েছে। কেননা বান্দা যখন আল্লাহর গুণাবলী বর্ণনা করলো তখন সে যেন মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহর সম্মুখে হাযির হয়ে গেল। এখন সে মালিককে সম্বোধন করে স্বীয় দীনতা, হীনতা ও দারিদ্রতা প্রকাশ করলো এবং বলতে লাগলোঃ “হে আল্লাহ! আমরা তো আপনার হীন ও দুর্বল দাস মাত্র এবং আমরা সর্বকার্যে, সর্বাবস্থা ও সাধনায় একমাত্র আপনারই মুখাপেক্ষী। এ আয়াতে একথারও প্রমাণ রয়েছে যে, এর পূর্ববর্তী সমস্ত বাক্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে খবর দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা স্বীয় উত্তম গুণাবলীর জন্যে নিজের প্রশংসা নিজেই করেছিলেন এবং বান্দাদেরকে ঐ শব্দগুলি দিয়েই তার প্রশংসা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এজন্যেই যে ব্যক্তি এ সূরাটি জানা সত্ত্বেও নামাযে তা পাঠ করে না তার নামায হয় না। যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে হযরত উবাদাহ বিন সাবিত হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তির নামাযকে নামায বলা যায় না যে নামাযের মধ্যে সূরা-ই-ফাতিহা পাঠ করে না। সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে, আল্লাহ বলেছেনঃ আমি নামাযকে আমার মধ্যে ও আমার বান্দার মধ্যে অর্ধেক অর্ধেক ভাগ করে নিয়েছি। অর্ধেক অংশ আমার ও বাকী অর্ধেক অংশ আমার বান্দার। বান্দা যা চাইবে তাকে তাই দেয়া হবে। বান্দা যখন اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ বলে, তখন আল্লাহ বলেনঃ “আমার বান্দা আমার প্রশংসা করলো।” বান্দা যখন বলে, الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ তখন তিনি বলেনঃ ‘আমার বান্দা আমার গুণগান করলো। যখন সে বলে مٰلِكِ یَوْمِ الدِّیْنِ তখন তিনি বলেনঃ “আমার বান্দা আমার শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করলো। সে যখন বলে اِیَّاكَ نَعْبُدُ وَ اِیَّاكَ نَسْتَعِیْنُ তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এটা আমার এবং আমার বান্দার মধ্যেকার কথা এবং আমার বান্দার জন্যে তাই রয়েছে যা সে চাইবে। অতঃপর বান্দা যখন শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলে তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন এ সব তো আমার বান্দার জন্যে এবং আমার বান্দা যা চাইবে তার জন্যে। তাই রয়েছে।'
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন যে, اِیَّاكَ نَعْبُدُ-এর অর্থ হচ্ছেঃ “হে আমার প্রভূ! আমরা বিশেষভাবে একত্ববাদে বিশ্বাসী, আমরা ভয় করি এবং মহান সত্তায় সকল সময়ে আশা রাখি। আপনি ছাড়া আর কারও আমরা ইবাদতও করি না, কাউকে ভয় করি না এবং কারও উপর আশাও রাখি না। আর وَ اِیَّاكَ نَسْتَعِیْنُ-এর তাৎপর্য ও ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমরা আপনার পূর্ণ আনুগত্য বরণ করি ও আমাদের সকল কার্যে একমাত্র আপনারই কাছে সহায়তা প্রার্থনা করি।
কাতাদাহ (রঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন তোমরা একমাত্র তাঁরই উপাসনা কর এবং তোমাদের সকল কার্যে তারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর।' اِیَّاكَ نَعْبُدُ কে পূর্বে আনার কারণ এই যে, ইবাদতই হচ্ছে মূল ঈপ্সিত বিষয়, আর সাহায্য চাওয়া ইবাদতেরই মাধ্যম ও ব্যবস্থা। আর সাধারণ নিয়ম হচ্ছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে পূর্বে বর্ণনা করা এবং কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে পরে বর্ণনা করা। আল্লাহ তা'আলাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন।
যদি প্রশ্ন করা হয় যে, এখানে বহুবচন অর্থাৎ আমরা ব্যবহার করার কি প্রয়োজন? যদি এটা বহুবচনের জন্যে হয় তবে উক্তিকারী তো একজনই। আর যদি সম্মান ও মর্যাদার জন্যে হয় তবে এ স্থানে এটা খুবই অশোভনীয়। কেননা, এখানে তো দীনতা ও বিনয় প্রকাশ করাই মুখ্য উদ্দেশ্য। এ প্রশ্নের উত্তর এই .যে, একজন বান্দা যেন সমস্ত বান্দার পক্ষ থেকে সংবাদ দিচ্ছে, বিশেষ করে যখন সে জামা'আতের সঙ্গে নামাযে দাঁড়ায় ও ইমাম নির্বাচিত হয়। সুতরাং সে যেন নিজেরও তার সমস্ত মুমিন ভাই-এর পক্ষ থেকে নতশিরে স্বীকার করছে যে, তারা সবাই তার দীনহীন বান্দা এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্যে সৃষ্ট হয়েছে, আর সে তাদের পক্ষ থেকে মঙ্গলের নিমিত্তে আগে বেড়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে এটা সম্মানের জন্যে। বান্দা যখন ইবাদত বন্দেগীতে আত্মনিয়োগ করে তখন যেন তাকেই বলা হয়ঃ “তুমি দ্র, তোমার সম্মান আমার দরবারে খুবই বেশী। সুতরাং তুমি اِیَّاكَ نَعْبُدُ وَ اِیَّاكَ نَسْتَعِیْنُ বলে নিজেকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ কর। কিন্তু যখন ইবাদত হতে আলাদা হবে তখন আমরা বলবে না, যদিও হাজার হাজার বা লাখ লাখ লোকের মধ্যে অবস্থান কর। কেননা, সবাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী ও তার দরবারে নিঃস্ব ভিক্ষুক। কারও কারও মতে اِیَّاكَ نَعْبُدُ-এর মধ্যে যতটা বিনয় ও নম্রতার ভাব রয়েছে। اِیَّاكَ عَبْدَنَا-এর মধ্যে ততটা নেই। কেননা এর মধ্যে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও ইবাদতের উপযুক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। অথচ আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ ও যথোপযুক্ত ইবাদত করতে কোন বান্দা কোন ক্রমেই সক্ষম নয়। কোন কবি বলেছেনঃ لَاتَدْعُنِيْ اِلَّا بِيَا عَبْدَهَا ـ فَاِنَّهٗ اَشْرَفُ اَسْمَائِىْ
অর্থাৎ “আমাকে তাঁর দাস বলেই ডাকো, কেননা এটাই আমার সর্বোত্তম নাম। যেখানে আল্লাহ তা'আলা তাঁর বড় বড় দানের কথা উল্লেখ করেছেন সেখানেই শুধু তিনি তাঁর রাসূলের (সঃ) নাম عَبْد বা দাস নিয়েছেন। বড় বড় নিয়ামত যেমন কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ করা, নামাযে দাঁড়ানো, মিরাজ করানো ইত্যাদি। যেমন তিনি বলেছেনঃ اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِیْۤ اَنْزَلَ عَلٰى عَبْدِهِ الْكِتٰبَ (১৮:১) আরও বলেছেনঃ (৭২:১৯) وَّ اَنَّهٗ لَمَّا قَامَ عَبْدُ اللّٰهِ یَدْعُوْهُ অন্যত্র বলেছেনঃ (১৭:১) سُبْحٰنَ الَّذِیْۤ اَسْرٰى بِعَبْدِهٖ لَیْلًا
সঙ্গে সঙ্গে কুরআন মাজীদের মধ্যে এ শিক্ষা দিয়েছেনঃ “হে নবী (সঃ)! বিরুদ্ধবাদীদের অবিশ্বাসের ফলে যখন তোমার মন সংকীর্ণ হয়ে পড়ে তখন তুমি আমার ইবাদতে লিপ্ত হয়ে যাও।' তাই নির্দেশ হচ্ছেঃ لَقَدْ نَعْلَمُ اَنَّكَ یَضِیْقُ صَدْرُكَ بِمَا یَقُوْلُوْنَ ـ فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَ كُنْ مِّنَ السّٰجِدِیْنَ ـ وَ اعْبُدْ رَبَّكَ حَتّٰى یَاْتِیَكَ الْیَقِیْنُ
অর্থাৎ “আমি জানি যে, শত্রুদের কথা তোমার মনে কষ্ট দিচ্ছে, সুতরাং সে সময় তুমি স্বীয় প্রভুর প্রশংসাকীর্তণ কর এবং সিজদাহ কর। আর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তোমার প্রভুর ইবাদতে লেগে থাক।' (১৫:৯৭-৯৯) ইমাম রাযী (রঃ) স্বীয় তাফসীরে কোন কোন লোক হতে নকল করেছেন যে, উবুদিয়তের মান রিসালতের মান হতে উত্তম। কেননা, ইবাদতের সম্পর্ক সৃষ্ট বান্দা হতে সৃষ্টিকর্তার দিকে হয়ে থাকে, আর রিসালাতের সম্পর্ক হয় সৃষ্টিকর্তা থেকে সৃষ্টির দিকে এবং এ দলীলের দ্বারাও যে, বান্দার সমস্ত সংশোধনমূলক কার্যের জিম্মাদার হন স্বয়ং আল্লাহ, আর রাসূল (সঃ) তাঁর উম্মতের সৎ কার্যাবলীর অভিভাবক হয়ে থাকেন। কিন্তু এ কথাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং এর দুটো দলীলই দুর্বল ও ভিত্তিহীন। বড়ই দুঃখের বিষয় এই যে, ইমাম ফাখরুদ্দীন রাযী না একে দুর্বল বললেন আর না একে পরিত্যাগ করলেন না এর বিরোধিতা করলেন। . কোন কোন সুফীর মত এই যে, ইবাদত করা হয় সাধারণতঃ পুণ্য লাভের উদ্দেশ্যে অথবা শাস্তি প্রতিরোধ করার মানসে। তিনি বলেন এটা কোন উপকারী কাজ নয়। কেননা, তখন উদ্দেশ্য থাকে শুধু স্বীয় স্বার্থ সিদ্ধির। ইবাদতের সবচেয়ে উত্তম পন্থা এই যে, মানুষ সেই মহান সত্তার ইবাদত করবে যিনি সমুদয় গুণে গুণান্বিত, ইবাদত করবে শুধু তার সত্তার জন্যে এবং উদ্দেশ্য অন্য কিছু আর থাকবে না। এজন্যেই নামাযের নিয়্যাত হয় শুধু আল্লাহর জন্যে নামায পড়ার। যদি ওটা পুণ্যলাভ ও শাস্তি হতে বাঁচার জন্যে হয় তবে তা বাতিল হয়ে যাবে। অন্য দল এটা খণ্ডন করে থাকেন এবং বলে থাকেন যে, পুণ্যের আশায় ও শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে ইবাদত করলেও ওটা একমাত্র আল্লাহর জন্যে হওয়াতে কোন অসুবিধে নেই। এর দলীল এই যে,একজন বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাজির হয়ে আরয করলোঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আপনার মত পড়তে জানি না এবং মু'আযের (রাঃ) মতও নয়। আমি তো শুধু আল্লাহর নিকট জান্নাত চাই এবং জাহান্নাম হতে মুক্তি কামনা করি। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ আমরাও তারই কাছাকাছি (উদ্দেশ্যে নামায) পড়ে থাকি।'
(6) আলোচ্য শব্দটি জমহুর صِرَاط পড়েছেন। কেউ কেউ سِرَاط পড়েছেন এবং ز দ্বারাও একটা পঠনের কথা বর্ণিত আছে। যারা বলেন যে, বনী উজরাহ্ ও বনী কালবের পঠন এটাই। যেহেতু বান্দা প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করেছে এবং তার গুণাবলী বর্ণনা করেছে, সেহেতু এখন তার কর্তব্য হবে স্বীয় প্রয়োজন পূরণের জন্যে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা। যেমন পূর্বেই হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ পাক বলেনঃ ‘অর্ধেক অংশ আমার ও অর্ধেক অংশ আমার বান্দর এবং আমার বান্দার জন্যে তাই রয়েছে যা সে চাইবে। একটু চিন্তা করলেই দেখা যাবে যে, اِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِیْمَ-এর মধ্যে কি পরিমাণ সূক্ষ্মতা ও প্রকৃষ্টতা রয়েছে। প্রথমে বিশ্ব প্রভুর যথোপযুক্ত প্রশংসা ও গুণকীর্তন, অতঃপর নিজের ও মুসলিম ভাইদের প্রয়োজন পূরণের জন্য আকুল প্রার্থনা। প্রার্থিত বস্তু লাভের এটাই উৎকৃষ্ট পন্থা। এ উত্তম পন্থা নিজে পছন্দ করেই মহান আল্লাহ এ পন্থা স্বীয় বান্দাদের বাতলিয়ে দিলেন। কখনও কখনও প্রার্থনার সময় প্রার্থী স্বীয় অবস্থা ও প্রয়োজন প্রকাশ করে থাকে। যেমন হযরত মূসা (আঃ) বলেছিলেনঃ رَبِّ اِنِّیْ لِمَاۤ اَنْزَلْتَ اِلَیَّ مِنْ خَیْرٍ فَقِیْرٌ
অর্থাৎ হে আমার প্রভু! যে কোন মঙ্গলই আপনি আমার নিকট পাঠান, আমি তার প্রত্যাশী ও মুখাপেক্ষী।' (২৮:২৪) হযরত ইউনুস (আঃ) দু'আর সময় বলেছিলেনঃ لَا اِلٰهَ اِلَّاۤ اَنْتَ سُبْحٰنَكَ اِنِّیْ كُنْتُ مِنَ الظّٰلِمِیْنَ অর্থাৎ আপনি ছাড়া আর কেউ উপাস্য নেই, আমি সর্বান্তঃকরণে আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং নিশ্চয় আমি অত্যাচারীগণের অন্তর্ভুক্ত হয়েছি।' (২১:৮৭) কোন কোন প্রার্থনায় প্রার্থী শুধুমাত্র প্রশংসা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেই নীরব থাকে। যেমন কবির কথাঃ اَاَذْكُرُ حَاجَتِىْ اَمْ قَدْ كَفَانِيْ ـ حَيَاءُكَ اَنَّ شِيْمَتَكَ الْحَيَاءُ ـ اِذَا اثْنٰى عَلَيْكَ الْمَرْءُ يَوْمًا ـ كَفَاهُ مَنْ تَعْرِضُهُ الثَّنَاءُ
অর্থাৎ আমার প্রয়োজনের বর্ণনা দেয়ার তেমন কোন দরকার নেই, তোমার দয়াপূর্ণ দানই আমার জন্যে যথেষ্ট। আমি জানি যে, দান ও সুবিচার তোমার পবিত্র ও চিরাচরিত অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত। শুধু তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করে দেয়া, তোমার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করাই আমার প্রয়োজন পূরণের জন্যে যথেষ্ট।
এখানে হিদায়াতের অর্থ ইরশাদ ও তাওফীক অর্থাৎ সুপথ প্রদর্শন ও সক্ষমতা প্রদান। কখনও এই ‘হিদায়াত' শব্দটি নিজেই مُتَعَدِّىْ বা সকর্মক ক্রিয়া হয়ে থাকে, যেমন এখানে হয়েছে। তাহলে اَعْطَنَا، وَرَزَقْنَا، وَفِقْنَا، اَلْهِمْنَا এ সবেরই অর্থ হবে আমাদেরকে প্রদান করুন। অন্যত্র রয়েছেঃ وَهَدَيْنَاهُ النَّجْدَيْنِ
অর্থাৎ আমি তাদেরকে ভাল ও মন্দ এ দুটি পথ দেখিয়েছি।' (৯০:১০) কখনও ‘হিদায়াত’ শব্দটি اِلٰى এর সঙ্গে مُتَعَدِّىْ বা সকর্মক ক্রিয়া হয়ে থাকে। যেমন বলেছেনঃ اِجْتَبٰىهُ وَ هَدٰىهُ اِلٰى صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍ (১৬:১২১) এবং অন্য জায়গায় বলেছেন فَاهْدُوْهُمْ اِلٰى صِرَاطِ الْجَحِیْمِ (৩৭:২৩) এখানে হিদায়াতের অর্থ পথ প্রদর্শন ও রাস্তা বাতলান। এইরূপ ঘোষণা রয়েছেঃ وَاِنَّكَ لَتَهْدِیْۤ اِلٰى صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍ অর্থাৎ “তুমি অবশ্যই সরল পথ প্রদর্শন করেছে।' (৪২:৫২) আবার কখনও هِدَايَت শব্দটি لَام এর সঙ্গে مُتَعَدِّى হয়ে থাকে। যেমন জ্বিন বা দানবের কথা কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছেঃ الْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِیْ هَدٰىنَا لِهٰذَا
অর্থাৎ সেই আল্লাহর সমুদয় প্রশংসা যিনি আমাদেরকে এর জন্যে পথ দেখিয়েছেন।' (৭:৪৩) (অর্থাৎ অনুগ্রহ পূর্বক সৎপথে পরিচালিত হওয়ার তাওফীক দান করেছেন) صِرَاطٍ مُّسْتَقِیْمٍ এর কয়েকটি অর্থ আছে। ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে সুস্পষ্ট, সরল ও পরিষ্কার রাস্তা যার কোন জায়গা বা কোন অংশই বাঁকা নয়। এ প্রসঙ্গে কবি জারীর বিন ' আতিয়া আল-খাতফী বলেনঃ اَمِيْرُ الْمُوْمِنِيْنَ عَلٰى صِرَاطٍ ـ اِذَا اَعْرَجَ الْمَوَارِدَ مُسْتَقِيْمٌ
রূপক অর্থে صِرَاط এর ব্যবহার আরবীয়দের কাছে কথা এবং কাজের উপরও হয়ে থাকে। আবার صِرَط এর বিশেষণ কখনও সোজা হয় এবং কখনও বাকা হয়। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাসসিরগণ হতে এর বহু তাফসীর নকল করা হয়েছে এবং ওগুলোর সারাংশ প্রায় একই, আর তা হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য। একটি মারফু হাদীসে আছে যে, صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) ইবনে জারীরও (রঃ) এরূপই বর্ণনা করেছেন। কুরআন কারীমের ফযীলত সম্পর্কীয় হাদীসে ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহর কিতাব এই কুরআন পাক হচ্ছে শক্ত রশি বা রঞ্জু, জ্ঞানপূর্ণ উপদেশ এবং সরল পথ বা সিরাতুম মুসতাকীম। (মুসনাদ-ই-আহমাদ ও জামে তিরমিযী) হযরত আলীরও (রাঃ) এটাই অভিমত। আল্লাহই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন।
হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) উক্তি রয়েছে যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেছিলেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! اِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِیْمَ বলুন। অর্থাৎ আমাদেরকে হিদায়াত বিশিষ্ট পথের ইলহাম করুন এবং তা হলো আল্লাহর দ্বীন, যার মধ্যে কোন বক্রতা নেই। তার নিকট থেকে এ কথাও বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ইসলাম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও বহু সাহাবী (রাঃ) হতেও এ তাফসীরই নকল করা হয়েছে। হযরত জাবির (রাঃ) বলেন صِرَاطِ مُسْتَقِيْم এর ভাবার্থ হচ্ছে ইসলাম যা আকাশ, পৃথিবী ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সমুদয় বস্তু হতে প্রশস্ততম। ইবনে হানাফিয়্যাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহর সেই দ্বীন যা ছাড়া অন্য দ্বীন গ্রহণীয় নয়। আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলামের (রঃ) উক্তি এই যে, صِرَاطِ مُسْتَقِيْم হচ্ছে ইসলাম। মুসনাদ-ই-আহমদের একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা صِرَاطِ مُسْتَقِيْم এর একটা দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। (তা এই যে,) সীরাতে মুসতাকীমের দুই দিকে দুইটি প্রাচীর রয়েছে। তাতে কয়েকটি খোলা দরজা আছে। দরজাগুলির উপর পর্দা লটকানো রয়েছে। সীরাতে মুসতাকীমের প্রবেশ দ্বারে সব সময়ের জন্যে একজন আহবানকারী নিযুক্ত রয়েছে। সে বলছে- হে জনমণ্ডলী! তোমরা সবাই এই সোজা পথ ধরে চলে যাও, আঁকা বাঁকা পথে যেওনা। ঐ রাস্তার উপরে একজন আহ্বানকারী রয়েছে। যে কেউ এ দরজাগুলির কোন একটি খুলতে চাচ্ছে সে বলছে-সাবধান, তা খোল , যদি খোল, তবে সোজা পথ থেকে সরে পড়বে। সীরাতে মুসতাকীম হচ্ছে ইসলাম, প্রাচীরগুলো আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ, প্রবেশ দ্বারে আহ্বানকারী হচ্ছে কুরআন কারীম এবং রাস্তার উপরের আহ্বানকারী হচ্ছে আল্লাহর ভয় যা প্রত্যেক ঈমানদারের অন্তরে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে উপদেষ্টা রূপে অবস্থান করে থাকে। এ হাদীসটি মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম, তাফসীর-ইইবনে জারীর, জামে তিরমিযী এবং সুনান-ই-নাসাঈর মধ্যেও রয়েছে এবং এর ইসনাদ হাসান সহীহ। আল্লাহই এ ব্যাপারে সবচাইতে ভাল জানেন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ‘হক বা সত্য'। তাঁর এ কথাটিই সবচাইতে ব্যাপক এবং এসব কথার মধ্যে পারস্পরিক কোন বিরোধ নেই।
হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে নবী (সঃ) ও তাঁর পরবর্তী দু’জন খলীফা (রাঃ)। আবুল আলিয়া (রঃ) এ কথাটির সত্যতা ও উৎকৃষ্টতা অপকটে স্বীকার করেন। প্রকৃতপক্ষে এ সব মত সঠিক এবং একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। নবী করীম (সঃ) এবং তাঁর দু'জন খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ও হযরত উমার ফারূকের (রাঃ) অনুসারীগণ ন্যায় ও সত্যের অনুসারী, যারা ইসলামের অনুসারী তারা পবিত্র কুরআনকে মান্যকারী এবং কুরআন আল্লাহর কিতাব, তাঁর সুদৃঢ় রঞ্জু এবং তার সোজা পথ। অতঃপর সীরাতে মুসতাকীমের তাফসীরের ব্যাপারে এ সমুদয় উক্তিই সঠিক এবং একে অপরের সত্যতা সমর্থনকারী। অতএব সমুদয় প্রশংসা একমাত্র আল্লাহরই জন্যে।
হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ সীরাতে মুসতাকীম সেই পুণ্য সনাতন পথ যার উপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে ছেড়ে গিয়েছেন। ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীরের (রঃ) ফায়সালা হচ্ছে এইঃ ‘আমার নিকট এ আয়াতের সর্বোত্তম তাফসীর এই যে, আমাদেরকে যেন এমন কাজের তাওফীক দেয়া হয় যা আল্লাহ তা'আলার ইঙ্গিত কাজ এবং যার উপর চললে আল্লাহ তাঁর বান্দার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং তাকে পুরস্কৃত করেন। এটাই সীরাতে মুসতাকীম। কেননা, তাকে এমন দানে ভূষিত করা হবে যে দান দ্বারা আল্লাহর মনোনীত বান্দাদেরকে ভূষিত করা হয়েছিল। যাঁরা নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং সৎ প্রকৃতির লোক ছিলেন। যারা ইসলাম ও রাসূলগণের (আঃ) সত্যতা সর্বোতভাবে স্বীকার করেছিলেন এবং কুরআনকে হাতে দাঁতে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছিলেন, যারা আল্লাহর নির্দেশাবলী নতশিরে মেনে চলে ছিলেন ও আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়াবলী হতে বিরত রয়েছিলেন। আর নবী করীম (সঃ), তাঁর চার খলীফা (রাঃ) ও সমস্ত সৎ বান্দার পথে চলবার তাওফীক দেয়া, এটাই হচ্ছে সীরাতে মুসতাকীম।”
যদি প্রশ্ন করা হয় যে, মুমিনের তো পূর্বেই আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত লাভ হয়ে গেছে, সুতরাং নামাযে বা বাইরে হিদায়াত চাওয়ার আর প্রয়োজন কি? তবে সেই প্রশ্নের উত্তর এই যে, এতে উদ্দেশ্য হচ্ছে হিদায়াতের উপর সদা প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক চাওয়া। কেননা, বান্দা প্রতিটি মুহূর্তে ও সর্বাবস্থায় প্রতিনিয়তই আল্লাহ তা'আলার আশাধারী ও মুখাপেক্ষী। সে নিজে স্বীয় জীবনের লাভ ক্ষতির মালিক নয়। বরং নিশিদিন সে আল্লাহরই প্রত্যাশী ও মুখাপেক্ষী। এ জন্যেই আল্লাহ পাক তাকে শিখিয়েছেন যে, সে যেন সর্বদা হিদায়াত প্রার্থনা করে এবং তার উপর সদা প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক চাইতে থাকে। ভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তাঁর দরজায় ভিক্ষুক করে নিয়েছেন। সে আল্লাহকে ডাকলে আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দিয়ে তার আকুল প্রার্থনা মঞ্জুর করার গুরু দায়িত্ব স্কন্ধে নিয়েছেন। বিশেষ করে দরিদ্র, অসহায় ও মুহতাজ ব্যক্তি যখন দিনরাত আল্লাহকে ডাকতে থাকে এবং প্রয়োজন পূরণের প্রার্থনা জানায়, আল্লাহ তখন তার সেই আকুল প্রার্থনা কবুলের জিম্মাদার হয়ে যান। আল্লাহ পাক কুরআন মাজীদে বলেছেনঃ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اٰمِنُوْا بِاللّٰهِ وَ رَسُوْلِهٖ وَ الْكِتٰبِ الَّذِیْ نَزَّلَ عَلٰى رَسُوْلِهٖ وَ الْكِتٰبِ الَّذِیْۤ اَنْزَلَ مِنْ قَبْلُ
অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উপর, তাঁর রাসূলের উপর, সেই কিতাবের উপর যা তিনি তাঁর রাসূলের উপর অবতীর্ণ করেছেন এবং ঐ সমুদয় কিতাবের উপর যা ইতিপূর্বে অবতীর্ণ করেছেন, এ সব কিছুর উপর তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর।' (৪:১৩৬) এ আয়াতে ঈমানদারগণকে ঈমান আনয়নের নির্দেশ দেয়া এমনই, যেমন হিদায়াত প্রাপ্তগণকে হিদায়াত চাওয়ার নির্দেশ দেয়া। এই দুই স্থানেই উদ্দেশ্য হচ্ছে তার উপরে অটল, অনড় ও দ্বিধাহীনচিত্তে স্থির থাকা। আর এমন কার্যাবলী সদা সম্পাদন করা যা উদ্দেশ্য লাভে সহায়তা করে।
এর উপর এ প্রতিবাদ উঠতে পারে না যে, এ তো হলো ‘তাহসীলে হাসিল অর্থাৎ প্রাপ্ত জিনিসের পুনঃ প্রাপ্তি। আল্লাহ এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। দেখুন মহান আল্লাহ তাঁর ঈমানদার বান্দাগণকে নিম্নের এ প্রার্থনা করারও নির্দেশ দিচ্ছেনঃ رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوْبَنَا بَعْدَ اِذْ هَدَیْتَنَا وَ هَبْ لَنَا مِنْ لَّدُنْكَ رَحْمَةًۚ-اِنَّكَ اَنْتَ الْوَهَّابُ
অর্থাৎ “হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদেরকে সুপথ প্রদর্শনের পর। আমাদের অন্তরসমূহ বাঁকা করবেন না এবং আমাদেরকে আপনার নিকট হতে করুণা প্রদান করুন, নিশ্চয় আপনি মহান দাতা।' (৩:৮)
এটাও বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) মাগরিবের তৃতীয় রাকআতে সূরা-ই ফাতিহার পরে এ আয়াতটি নিম্ন স্বরে পড়তেন। সুতরাং اِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِیْمَ এর অর্থ দাঁড়ালোঃ “হে আল্লাহ! আমাদেরকে সরল ও সোজা পথের উপর অটল ও স্থির রাখুন। এবং তা হতে আমাদেরকে দূরে অপসারিত করে ফেলবেন না।”
(7) এর বর্ণনা পূর্বেই গত হয়েছে যে, বান্দার এ কথার উপর মহান আল্লাহ বলেন, এটা আমার বান্দার জন্যে এবং আমার বান্দার জন্যে ঐ সব কিছুই রয়েছে যা সে চাইবে।' এ আয়াতটি সীরাতে মুসতাকীমের তাফসীর এবং ব্যাকরণবিদ বা নাহ্বীদের নিকট এটা ‘সীরাতে মুসতাকীম' হতে বদল হয়েছে এবং আত বায়ানও হতে পারে। আল্লাহ তা'আলাই এ সম্পর্কে সবচাইতে ভাল জানেন। আর যারা আল্লাহর পুরস্কার লাভ করেছে তাদের বর্ণনা সূরা-ই-নিসার মধ্যে এসেছে। ইরশাদ হচ্ছেঃ وَ مَنْ یُّطِعِ اللّٰهَ وَ الرَّسُوْلَ فَاُولٰٓىٕكَ مَعَ الَّذِیْنَ اَنْعَمَ اللّٰهُ عَلَیْهِمْ مِّنَ النَّبِیّٖنَ وَ الصِّدِّیْقِیْنَ وَ الشُّهَدَآءِ وَ الصّٰلِحِیْنَۚ-وَ حَسُنَ اُولٰٓىٕكَ رَفِیْقًا ـ ذٰلِكَ الْفَضْلُ مِنَ اللّٰهِؕ-وَ كَفٰى بِاللّٰهِ عَلِیْمًا
অর্থাৎ ‘এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের অনুগত হয়, এরূপ ব্যক্তিগণও ঐ মহান ব্যক্তিগণের সহচর হবেন যাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ করেছেন, অর্থাৎ নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও নেক্কারগণ। আর ঐ মহাপুরুষগণ উত্তম সহচর। এ অনুগ্রহ আল্লাহর পক্ষ হতে এবং সর্বজ্ঞ হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।' (৪:৬৯-৭০)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ঐ সব ফেরেশতা, নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং সৎলোকের পথে পরিচালিত করুন যাদেরকে আপনি আপনার আনুগত্য ও ইবাদতের কারণে পুরস্কৃত করেছেন।” উল্লিখিত আয়াতটি নিম্ন বর্ণিত আয়াতের মত। (৪:৬৯) وَ مَنْ یُّطِعِ اللّٰهَ وَ الرَّسُوْلَ فَاُولٰٓىٕكَ مَعَ الَّذِیْنَ اَنْعَمَ اللّٰهُ عَلَیْهِمْ
হযরত রাবী' বিন আনাস (রাঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে নবীগণ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুজাহিদ (রঃ) এর অর্থ নিয়েছেন মুমিনগণ’ এবং হযরত অকী (রঃ) নিয়েছেন মুসলমানগণ।' আবদুর রহমান (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সহচরবর্গ (রাঃ)। হযরত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) কথাই বেশী ব্যাপক। আল্লাহ তা'আলাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। غَیْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَیْهِمْ وَ لَا الضَّآلِّیْنَ এই غَیْرِ নামক শব্দটিতে জমহুরের পঠনে غَیْرِ (গাইরি) আছে অর্থাৎ ر অক্ষরের নীচে ‘যের ' এবং তা বিশেষণ করা হয়েছে। আল্লামা যামাখশারী বলেছেন যে, ر কে যবরের সঙ্গে পড়া হয়েছে এবং তা ‘হাল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং হযরত উমার বিন খাত্তাবের (রাঃ) পঠন এটাই। عَلَيْهِمْ এর সর্বনামটি ওর ذُوالْحَال এবং اَنْعَمْتَ হচ্ছে عَامِل, তাহলে অর্থ হচ্ছেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সরল সোজা পথ প্রদর্শন করুন, ঐ সব লোকের পথ যাদেরকে আপনি পুরস্কৃত করেছেন, যারা হিদায়াত বা সুপথ প্রাপ্ত এবং অটল অবিচলিত ছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) অনুগত ছিলেন। যারা আল্লাহর নির্দেশ পালনকারী ও নিষিদ্ধ কাজ হতে দূরে-বহুদূরে অবস্থানকারী ছিলেন। আর ঐ সব লোকের পথ হতে রক্ষা করুন যাদের উপর আপনার ধূমায়িত ক্রোধ ও অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে, যারা সত্যকে জেনে শুনেও তা থেকে দূরে সরে গেছে এবং পথভ্রষ্ট লোকেদের পথ হতেও আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখুন যাদের সঠিক পথ সম্পর্কে কোন ধারণা ও জ্ঞানই নেই, যারা পথভ্রষ্ট হয়ে লক্ষ্যহীনভাবে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়ায় এবং তাদেরকে সরল, সঠিক পুণ্য পথ দেখানো হয় না।
কথার মধ্যে খুব বেশী গুরুত্ব আনয়নের জন্যে لَا অক্ষরটিকে غَيْر এর পরে আনা হয়েছে, যেন জানতে পারা যায় যে, এখানে ভুলপথ দুইটি। একটি ইয়াহূদীদের পথ এবং অপরটি খৃষ্টানদের পথ। কোন কোন নাহবী বা ব্যাকরণবিদ বলেছেন যে, এখানে غَيْر শব্দটি اِسْتِثْنَاء বা প্রভেদ সৃষ্টির জন্যে এসেছে। তা হলে এটা اِسْتِثْنَاء مُنْقَطِع হতে পারে। কেননা যাদের উপর অনুগ্রহ করা হয়েছে তাদের মধ্য হতে এ اِسْتِثْنَاء হচ্ছে অথচ এরা তাদের অন্তর্ভুক্তই ছিল না। কিন্তু আমরা যে তাফসীর করেছি এটাই বেশী উত্তম। আরব কবিদের কবিতায় এরূপ দেখা যায় যে, তারা বিশেষ্যকে লোপ করে শুধুমাত্র বিশেষণের বর্ণনা দিয়ে থাকেন। যেমন নিম্নের কবিতায় রয়েছেঃ كَاَنَّكَ مِنْ جَمَالٍ بَنِىْ اُقَيْشٍ ـ يُقَعْقِعُ عِنْدَ رِجْلَيْهِ يُشُنٌ
এখানে مِنْ শব্দের আগে جَمَل নামক বিশেষ্যটিকে সোপ করা হয়েছে এবং পরবর্তী পর্যায়ের বিশেষণকে যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। এভাবেই আয়াতেও বিশেষণের বর্ণনা রয়েছে এবং صِرَاط -নামক বিশেষ্যকে লোপ করা হয়েছে।
غَیْرِ الْمَغْضُوْبِ এর ভাবার্থ হচ্ছে غَیْرِ صِرَاطِ الْمَغْضُوْبِ অর্থাৎ অভিশপ্তদের পথে নয়। مُضَاف এর উল্লেখ না করে مُضَاف اِلَيْهِ এর উল্লেখই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। পূর্ব শব্দগুলিই এটা প্রমাণ করছে। পূর্বে এ শব্দটি দুইবার এসেছে। কেউ কেউ বলেন যে وَ لَا الضَّآلِّیْنَ এর لَا শব্দটি অতিরিক্ত। তাদের মতে বাক্যটি হবে নিম্নরূপঃ غَیْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَیْهِمْ وَالضَّآلِّیْنَ এবং আরব কবিদের কবিতাতেও এর সাক্ষ্য রয়েছে। যেমন কবি আজ্জাজ বলেনঃ فِىْ بِئْرٍ لَا حُوْرٍ ـ سَعٰى مَا شَعَرَ
এখানে لَا শব্দটি অতিরিক্ত। কিন্তু সঠিক কথা সেইটাই যা আমরা ইতিপূর্বে লিখেছি। হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) হতে সহীহ সনদে غَیْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَیْهِمْ وَ الضَّآلِّیْنَ পড়াও বর্ণিত আছে। আবু উবাইদ আল কাসেম বিন সাল্লাম “কিতাবু ফাযাইলিল কুরআন' এর মধ্যে একথা বর্ণনা করেছেন। হযরত উবাই বিন কা'ব (রাঃ) হতেও এরূপ বর্ণিত আছে। এ মহান ব্যক্তিদ্বয় হতে যদি এটা ব্যাখ্যাদান রূপেও প্রকাশ পেয়ে থাকে তবে তো এটা আমাদের মতেরই সহায়ক হবে। তা হলো এই যে, لَا কে نَفِىْ تَاكِيْد এর জন্যে আনা হয়েছে, যাতে এ সন্দেহ না থাকে যে, এটা اَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ এর عَطْف উপর হয়েছে এবং এ জন্যেও যে, যাতে দুইটি পথের পার্থক্য অনুধাবন করা যায়, যেন প্রত্যেকেই এ দুটো পথ থেকে বেঁচে থাকে। ঈমানদারদের পন্থা তো এটাই যে, সত্যের জ্ঞানও থাকতে, হবে এবং তার আমলও থাকতে হবে। ইয়াহূদীদের আমল নেই এবং খৃষ্টানদের জ্ঞান নেই। এজন্যেই ইয়াহূদীরা অভিশপ্ত হলো এবং খৃষ্টানেরা হলো পথভ্রষ্ট। কেননা, জেনে শুনে ইচ্ছাকৃতভাবে আমল পরিত্যাগ করা লা'নত বা অভিশাপের কারণ হয়ে দাড়ায়। খৃষ্টানেরা যদিও একটা জিনিসের ইচ্ছে করে, কিন্তু তার সঠিক পথ তারা পায় না। কেননা, তাদের কর্মপন্থা ভুল এবং তারা সত্যের অনুসরণ হতে দূরে সরে পড়েছে। অভিশাপ ও পথভ্রষ্টতা এই দুই দলের তো রয়েছেই কিন্তু ইয়াহুদী অভিশাপের অংশে একধাপ এগিয়ে রয়েছে। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ قَدْ ضَلُّوْا مِنْ قَبْلُ وَ اَضَلُّوْا كَثِیْرًا وَّ ضَلُّوْا عَنْ سَوَآءِ السَّبِیْلِ
অর্থাৎ এরা পূর্ব হতেই পথভ্রষ্ট এবং অনেককেই পথভ্রষ্ট করেছে এবং তারা সোজা পথ হতে ভ্রষ্ট রয়েছে। (৫:৭৭) একথার সমর্থনে বহু হাদীস ও বর্ণনা পেশ করা যেতে পারে। মুসনাদ-ই-আহমাদে আছে যে, হযরত আদী বিন হাতিম (রাঃ) বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সেনাবাহিনী একদা আমার ফুফুকে এবং কতকগুলো লোককে বন্দী করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এনে হাজির করেন। আমার ফুফু তখন বলেনঃ “আমাকে দেখা শোনা করার লোক দূরে সরে রয়েছে এবং আমি একজন অধিক বয়স্কা অচলা বৃদ্ধা। আমি কোন খিদমতের যোগ্য নই। সুতরাং দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন। আল্লাহ আপনার উপরও দয়া করবেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “যে তোমার খবরাখবর নিয়ে থাকে সে ব্যক্তিটি কে?' তিনি বললেন-আদী বিন হাতিম।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “সে কি ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ) হতে এদিক ওদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বিনা শর্তে মুক্তি দিয়ে দেন। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফিরে আসেন তখন তার সাথে আর একটি লোক ছিলেন। খুব সম্ভব তিনি হযরত আলীই (রাঃ) ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ যাও, তার কাছে গিয়ে সোয়ারীর প্রার্থনা কর।' আমার ফুফু তাঁর কাছে প্রার্থনা জানালে সঙ্গে সঙ্গে তা মঞ্জুর হয় এবং তিনি সোয়ারী পেয়ে যান। তিনি এখান হতে মুক্তি লাভ করে সোজা আমার নিকট চলে আসেন এবং বলেনঃ রাসূলুল্লাহর (সঃ) দানশীলতা তোমার পিতা হাতিমকেও ছাড়িয়ে গেছে। তার কাছে একবার কেউ গেলে আর শূন্য হস্তে ফিরে আসে না।' একথা শুনে আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাজির হই। আমি দেখি যে, ছোট ছেলে ও বৃদ্ধা স্ত্রীলোকেরা তাঁর কাছে অবাধে যাতায়াত করছে এবং তিনি তাদের সাথে অকুণ্ঠচিত্তে অকৃত্রিমভাবে আলাপ আলোচনা করছেন। এ দেখে আমার বিশ্বাস হলো যে, তিনি কাইসার ও কিসরার মত বিশাল রাজত্ব ও সম্মানের অভিলাষী নন। তিনি আমাকে দেখে বলেনঃ ‘আদী! لَااِلٰهَ اِلَّااللّٰهُ বলা হতে পালিয়ে বেড়াচ্ছ কেন? আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ উপাসনার যোগ্য আছে কি? اَللهُ اَكْبَرُ বলা হতে এখন তুমি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ কেন? মহা সম্মানিত আল্লাহ পাক থেকে বড় আর কেউ আছে কি? (তার এই কথাগুলো এবং তাঁর সরলতা ও অকৃত্রিমতা আমার উপর এমনভাবে দাগ কাটলো ও ক্রিয়াশীল হলো যে,) আমি তৎক্ষণাৎ কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম। তাতে তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং বলেনঃ مَغْضُوْبِ عَلَیْهِمْ দ্বারা ইয়াহূদকে বুঝানো হয়েছে এবং ضَالِّيْنَ দ্বারা খৃষ্টানগণকে বুঝানো হয়েছে। আরও একটি হাদীসে আছে যে, হযরত আদীর (রাঃ) প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই তাফসীরই করেছিলেন। এ হাদীসের অনেক সনদ আছে এবং বিভিন্ন শব্দে সে সব বর্ণিত হয়েছে।
বানূ কাইনের একটি লোক 'ওয়াদীউল কুরায়' রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এটাই প্রশ্ন করেছিলেন এবং উত্তরে তিনি একথাই বলেছিলেন। কোন কোন বর্ণনায় তাঁর নাম দেয়া হয়েছে আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ)। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)- এর তাফসীরে হযরত আবু যার (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) এবং আরও বহু সাহাবী (রাঃ) হতেও এ তাফসীর মকল করা হয়েছে। হযরত রাবী' বিন আনাস (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) প্রভৃতি মনীষীগণও একথাই বলেন। বরং ইবনে আবি হাতিম (রঃ) তো বলেন যে, মুফাসসিরগণের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই। এই ইমামগণের এতোফসীরের একটি দলীল হচ্ছে ঐ হাদীসটি যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে সূরা-ই-বাকারার এ আয়াতটি যাতে বানী ইসরাঈলগণকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে। (২:৯০) بِئْسَمَا اشْتَرَوْا بِهٖۤ اَنْفُسَهُمْ اَنْ یَّكْفُرُوْا بِمَاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ بَغْیًا اَنْ یُّنَزِّلَ اللّٰهُ مِنْ فَضْلِهٖ عَلٰى مَنْ یَّشَآءُ مِنْ عِبَادِهٖۚ-فَبَآءُوْ بِغَضَبٍ عَلٰى غَضَبٍؕ-وَ لِلْكٰفِرِیْنَ عَذَابٌ مُّهِیْنٌ
এ আয়াতের মধ্যে আছে যে, তাদের উপর অভিশাপের পর অভিশাপ অবতীর্ণ। হয়েছে এবং সূরা-ই-মায়েদার قُلْ هَلْ اُنَبِّئُكُمْ بِشَرٍّ (৫৪৬০) এই আয়াতের মধ্যেও রয়েছে যে, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ অবতীর্ণ হয়েছে। অন্য জায়গায় রয়েছেঃ لُعِنَ الَّذِیْنَ كَفَرُوْا مِنْۢ بَنِیْۤ اِسْرَآءِیْلَ عَلٰى لِسَانِ دَاوٗدَ وَ عِیْسَى ابْنِ مَرْیَمَؕ-ذٰلِكَ بِمَا عَصَوْا وَّ كَانُوْا یَعْتَدُوْنَ ـ كَانُوْا لَا یَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُّنْكَرٍ فَعَلُوْهُؕ-لَبِئْسَ مَا كَانُوْا یَفْعَلُوْنَ
অর্থাৎ বানী ইসরাঈলদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদের উপর দাউদ (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ) এর কথায় অভিশাপ দেয়া হয়েছে; কারণ তারা অবাধ্য হয়েছিল ও সীমা অতিক্রম করেছিল। এসব লোক কোন খারাপ কাজ হতে একে অপরকে বাধা দিতো না। নিশ্চয়ই তাদের কাজ ছিল অত্যন্ত জঘন্য। (৫:৭৮-৭৯)
ইতিহাসের পুস্তকসমূহে বর্ণিত আছে যে, যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল যখন খাঁটি ধর্মের অনুসন্ধানে স্বীয় বন্ধুবান্ধব ও সাথী-সঙ্গীসহ বেরিয়ে পড়লেন এবং এদিক ওদিক বিচরণের পর শেষে সিরিয়ায় আসলেন, তখন ইয়াহূদীরা তাদেরকে বললোঃ “আল্লাহর অভিশাপের কিছু অংশ না নেয়া পর্যন্ত আপনারা আমাদের ধর্মে আসতেই পারবেন না। তারা উত্তরে বললেনঃ তা হতে বাঁচার উদ্দেশ্যেই তো আমরা সত্য ধর্মের অনুসন্ধানে বের হয়েছি, কাজেই কিরূপে তা গ্রহণ করতে পারি? তারা খৃষ্টানদের সাথে সাক্ষাৎ করলে তারা বললোঃ “আল্লাহ তা'আলার লা'নত ও অসন্তুষ্টির কিছু অংশ না নেয়া পর্যন্ত আপনারা আমাদের ধর্মেও আসতে পারবেন না। তারা বললেনঃ আমরা এটাও করতে পারি না। তারপর হযরত যায়েদ বিন আমর বিন নোফাইল স্বাভাবিক ধর্মের উপরই রয়ে গেলেন। তিনি মুর্তি পূজা ও স্বগোত্রীয় ধর্মত্যাগ করলেন, কিন্তু ইয়াহুদী ও খৃষ্টান ধর্ম কোন ক্রমেই গ্রহণ করলেন না। তবে তার সঙ্গী সাথীরা খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করলো, কেননা ইয়াহূদীদের ধর্মের সঙ্গে এর অনেকটা মিল ছিল। যায়েদের ধর্মেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন অরাকা বিন নাওফিল। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নবুওতের যুগ পেয়েছিলেন এবং আল্লাহর হিদায়াত তাঁকে সুপথ প্রদর্শন করেছিল। তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর উপর ঈমান এনেছিলেন ও সেই সময় পর্যন্ত যে ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছিল তিনি তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হউন।
জিজ্ঞাস্যঃ
ضَاد এবং ظَا-এর মধ্যে অতি সামান্য পার্থক্য রয়েছে। এজন্যে উলামা-ই-কিরামের সহীহ মাযহাব এই যে, এ পার্থক্য ক্ষমার্হ । ضَاد এর সহীহ মাখরাজ হচ্ছে জিহবার প্রথম প্রান্ত এবং ওর পার্শ্বের চোয়াল। আর ظَا এর মাখরাজ হচ্ছে জিহবার এক দিক এবং সম্মুখের উপরের দুই দাঁতের প্রান্ত। দ্বিতীয় কথা এই যে, এই দুটি অক্ষর হচ্ছে رِخْوَه مَجْهُوْرَهْ এবং مُطْبِقَهْ সুতরাং যে ব্যক্তির পক্ষে এই দুইটি অক্ষরের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হবে সে যদি ضاد কে ظا এর মত পড়ে ফেলে তবে তার অপরাধ অমার্জনীয় নয়, বরং তাকে ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখা হবে। একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ضاد কে সবচেয়ে সঠিকভাবে পড়তে আমিই পারি। কিন্তু হাদীসটি সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন ও দুর্বল।
পরিচ্ছেদ
এই কল্যাণময় ও বরকতপূর্ণ সূরাটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর সমষ্টি। এই সাতটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলার যোগ্য প্রশংসা, তার শ্রেষ্ঠত্ব, পবিত্র নামসমূহ এবং উচ্চতম বিশেষণের সুন্দর বর্ণনা রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই রোজ কিয়ামতের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং বান্দাদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে যে, তারা যেন সেই মহান প্রভুর নিকট অত্যন্ত বিনীতভাবে যাচ্ঞা করে, যেন তার কাছে নিজের দারিদ্র ও অসহায়ত্বের কথা অকপটে স্বীকার করে, তাকে সব সময় অংশীবিহীন ও তুলনাবিহীন মনে করে, খাটি অন্তরে তাঁর ইবাদত; তাঁর অহদানিয়াত বা একত্ববাদে বিশ্বাস করে, তার কাছে সরল সোজা পথ ও তার উপর সুদৃঢ় ও অটল থাকার জন্যে নিশিদিন আকুল প্রার্থনা জানায়। এই অবিসম্বাদিত পথই একদিন তাকে রোজ কিয়ামতের পুলসিরাত পার করাবে এবং নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং নেককারদের পার্শ্বে জান্নাতুল ফিরদাউসের নন্দন কাননে স্থান দেবে। সাথে সাথে আলোচ্য সূরাটির মধ্যে যাবতীয় সকার্যাবলী সম্পাদনের প্রতি নিরন্তর উৎসাহ দেয়া হয়েছে যাতে কিয়ামতের দিন বান্দা আত্মকৃত নেকী ও পুন্যসমূহ সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে এবং মিথ্যা ও অন্যায় পথে চলা থেকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে, যাতে কিয়ামতের দিনেও সে বাতিলপন্থীদের দল থেকে দূরে থাকতে পারে। এই বাতিলপন্থী দল হচ্ছে ইয়াহূদী এবং খৃষ্টান।
ধীরস্থির ও সূক্ষ্মভাবে জাগ্রত মস্তিষ্ক নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে দেখলে অতি সহজেই অনুধাবন করা যাবে যে, আল্লাহ তা'আলার বর্ণনারীতি কি সুন্দর! আলোচ্য সূরায় اَنْعَمْتَ নামক বাক্যাংশে দানের ইসনাদ বা সম্পর্ক আল্লাহর দিকে করা হয়েছে এবং اَنْعَمْتَ বলা হয়েছে। কিন্তু غَضَب এর ইসনাদ করা হয়নি; বরং এখানে কর্তাকেই লোপ করা হয়েছে এবং مَغْضُوْبِ عَلَيْهِمْ বলা হয়েছে। এখানে বিশ্ব প্রভুর মহান মর্যাদার প্রতি যথাযোগ্য লক্ষ্য রাখা হয়েছে। অবশ্য প্রকৃতপক্ষে মূল কর্তা আল্লাহ তা'লাই। যেমন অন্যস্থানে বলা হয়েছে وَغَضِبَ اللهُ عَلَيْهِمْ এরূপভাবেই ভ্রষ্টতার ইসনাদ পথভ্রষ্টের দিকেই করা হয়েছে। অথচ অন্য এক জায়গায় আছেঃ مَنْ يَّهْدِ اللهُ فَهُوَ الْمُهْتَدِ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَنْ تَجِدَ لَهٗ وَلِيَّا مُّرْشِدًا
অর্থাৎ আল্লাহ যাকে সুপথ প্রদর্শন করেন সে সুপথ প্রাপ্ত এবং যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন তার কোন বন্ধু ও পথ প্রদর্শক নেই।' (১৮:১৭) আর এক জায়গায় আছে, مَنْ یُّضْلِلِ اللّٰهُ فَلَا هَادِیَ لَهٗؕ-وَ یَذَرُهُمْ فِیْ طُغْیَانِهِمْ یَعْمَهُوْنَ অর্থাৎ আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্যে কোন পথ প্রদর্শক নেই এবং সে তো স্বীয় অবাধ্যতার মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে ফিরছে?' (৭:১৮৬) এ রকমই আরও বহু আয়াত রয়েছে যদ্দ্বারা একথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, পথ প্রদর্শনকারী ও পথ বিভ্রান্তকারী হচ্ছেন একমাত্র মহান আল্লাহ।
কাদরিয়্যাহ দল, যারা কতকগুলো অস্পষ্ট আয়াতকে দলীলরূপে গ্রহণ করে বলে থাকে যে, বান্দা তার ইচ্ছাধীন ও মুক্ত স্বাধীন, সে নিজেই পছন্দ করে এবং নিজেই সম্পাদন করে। কিন্তু তাদের একথা ভ্রমাত্মক ও প্রমাদপূর্ণ। এটা খণ্ডনের জন্যে ভূরি ভূরি স্পষ্ট আয়াতসমূহ বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু বাতিল পন্থীদের এটাই রীতি যে, তারা স্পষ্ট আয়াতকে পরিহার করে অস্পষ্ট আয়াতের পিছনে লেগে থাকে। বিশুদ্ধ হাদীসে আছেঃ “যখন তোমরা ঐ লোকদেরকে দেখ যারা অস্পষ্ট আয়াতসমূহের পিছনে লেগে থাকে তখন বুঝে নিও যে, তারা ওই যাদের নাম স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা নিয়েছেন এবং স্বীয় কিতাবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং তোমরা তাদের থেকে সতর্ক থাক। এ নির্দেশনামায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর ইঙ্গিত এই আয়াতের প্রতি রয়েছেঃ فَاَمَّا الَّذِیْنَ فِیْ قُلُوْبِهِمْ زَیْغٌ فَیَتَّبِعُوْنَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَآءَ الْفِتْنَةِ وَ ابْتِغَآءَ تَاْوِیْلِهٖ
অর্থাৎ সুতরাং যাদের অন্তরে বঞতা রয়েছে তারা গোলযোগ সৃষ্টি এবং এর (মনগড়া) ব্যাখ্যা অন্বেষণের উদ্দেশ্যে এর ঐ অংশের পিছনে পড়ে থাকে যা দুর্বোধ্য ও অস্পষ্ট মর্ম বিশিষ্ট। সুতরাং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত যে, বিদআতীদের অনুকূলে কুরআন পাকের মধ্যে সঠিক ও অকাট্য দলীল একটিও নেই। কুরআন মাজীদের আগমন সূচিত হয়েছে সত্য ও মিথ্যা, হিদায়াত ও গুমরাহীর মধ্যে পার্থক্য প্রদর্শনের জন্যেই। বৈপরীত্ব ও মতবিরোধের জন্যে অসেনি বা তার অবকাশও এতে নেই। এতে মহাবিজ্ঞ ও প্রশংসিত আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ হয়েছে লাওহে মাহফু’ বা রক্ষিত ফলক থেকে।"
পরিচ্ছেদ
সূরা ফাতিহা শেষ করে আমীন বলা মুসতাহাব। اٰمِيْن শব্দটি يَاسِيْن শব্দটির মত এবং এটা اٰمِيْن ও পড়া হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছেঃ “ হে আল্লাহ! আপনি কবুল করুন। আমীন বলা মুসতাহাব হওয়ার দলীল হলো ঐ হাদীসটি যা মুসনাদ-ই-আহমদ, সুনান-ই-আবি দাউদ এবং জামে তিরমিযীতে হযরত অয়েল বিন হুজর (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে غَیْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَیْهِمْ وَ لَا الضَّآلِّیْنَ পড়ে اٰمِيْن বলতে শুনেছি। তিনি স্বর দীর্ঘ করতেন।” সুনান-ই- আবি দাউদে আছে যে, তিনি স্বর উচ্চ করতেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সশব্দ আমীন তার নিকটবর্তী প্রথম সারির লোকেরা স্পষ্টতঃই শুনতে পেতেন। সুনান-ই-আবি দাউদ ও সুনান-ই-ইবনে মাজায় এ হাদীসটি আছে। সুনান-ই-ইবনে মাজায় এও আছে যে, আমীনের শব্দে গোটা মসজিদ প্রতিধ্বনিত হয়ে বেজে উঠতো।' ইমাম দারে-কুতনীও (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং একে 'হাসান' বলে মন্তব্য করেছেন।
হযরত বেলাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “আমার পূর্বে ‘আমীন' বলবে না।"হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত জাফর সাদিক (রঃ) হতে 'আমীন' বলা বর্ণিত আছে। যেমন কুরআন মজীদের মধ্যে اٰمِّیْنَ الْبَیْتَ الْحَرَامَ (৫:২) রয়েছে। আমাদের সহচরেরা বলেন যে, নামাযের বাইরে থাকলেও ‘আমীন' বলতে হবে। তবে যে ব্যক্তি নামাযে থাকবে তার জন্যে বেশী জোর দেয়া হয়েছে। নামাযী একাকী হোক বা মুকতাদী হোক বা ইমাম হোক, সর্বাবস্থায় তাকে আমীন বলতেই হবে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন ইমাম ‘আমীন' বলেন তখন তোমরাও আমীন বল। যার আমীন বলার শব্দ ফেরেশতাদের আমীনের সঙ্গে মিলিত হয় তার পূর্বেকার সমস্ত পাপ মোচন হয়ে যায়।
সহীহ মুসলিম শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমাদের মধ্যে কেউ নামাযে ‘আমীন' বলে এবং ফেরেশতারাও আকাশে ‘আমীন বলেন, আর একের আমীনের সঙ্গে অন্যের ‘আমীন মিলিত হয় তখন তার পূর্বেকার সমস্ত গোনাহ মাফ হয়ে যায়। এর ভাবার্থ এই যে, তার আমীন ও ফেরেশতাদের ‘আমীন' বলার সময় একই হয় বা কবুল হওয়া হিসেবে অনুরূপ হয় অথবা আন্তরিকতায় অনুরূপ হয়। সহীহ মুসলিমের মধ্যে হযরত আবু মূসা আশ'আরী (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছেঃ “যখন ইমাম وَلَا الضَّآلِّیْنَ বলেন তখন তোমরা ‘আমীন' বল, আলাহ কবুল করবেন।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমীনের অর্থ কি' তিনি বললেনঃ হে আল্লাহ! আপনি কবুল করুন। জওহারী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ ‘যেন এরূপই হয়।' ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে আমাদের আশা ভঙ্গ করবেন না। অধিকাংশ আলেম বলেন যে, এর অর্থ হলোঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের প্রার্থনা কবুল করুন।' মুজাহিদ (রঃ), জাফর সাদিক (রঃ) এবং হিলাল বিন সিয়াফ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলার নাম সমূহের মধ্যে আমীনও একটি নাম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মার’ রূপে এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। কিন্তু তা বিশুদ্ধ নয়।
ইমাম মালিকের (রঃ) সহচরগণের মাযহাব এই যে, ইমাম ‘আমীন’ বলবেন , শুধু মুকতাদীগণ ‘আমীন’ বলবেন। কেননা ইমাম মালিকের (রঃ) মুআত্তার হাদীসে আছে :যখন ইমাম وَلَا الضَّآلِّیْنَ বলে তখন তোমরা আমীন’ বল। এ রকমই তার দলীলের সমর্থনে সহীহ মুসলিমে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতেও একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন ইমাম وَ لَا الضَّآلِّیْنَ বলে তখন তোমরা আমীন বল।' কিন্তু সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীস ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে-'যখন ইমাম আমীন বলে তখন তোমরাও আমীন’ বল।' হাদীসে এটাও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) وَلَا الضَّآلِّیْنَ বলে ‘আমীন’ বলতেন। উচ্চৈস্বরে পঠিত নামাযে মুকতাদী উচ্চৈস্বরে আমীন বলবে কিনা সে বিষয়ে আমাদের সহচরদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এর ব্যাখ্যা এই যে, যদি ইমাম ‘আমীন' বলতে ভুলে যান তবে মুকতাদীগণ জোরে আমীন বলবে। যদি ইমাম নিজেই উচ্চৈস্বরে আমীন বলেন তবে নতুন কথা মতে মুকতাদী জোরে আমীন বলবে না। ইমাম আবু হানীফার (রঃ) এটাই মাযহাব। ইমাম মালিক হতেও এরূপ একটি বর্ণনা রয়েছে। কেননা, নামাযের অন্যান্য যিকরের মত এটাও একটা যি। সুতরাং অন্যান্য যি যেমন উচ্চ শব্দে হয়, তেমনই এটাও উচ্চ শব্দে পড়া হবে না। কিন্তু পূর্ব যুগীয় মনীষীদের কথা এই যে, “আমীন’ উচ্চ শব্দেও পড়া যায়। ইমাম আহমদ বিন হাম্বলেরও (রঃ) মাযহাব এটাই এবং দ্বিতীয় বর্ণনা অনুসারে ইমাম মালিকের (রঃ) এটাই মাযহাব। এর দলীল ঐ হাদীসটি যা ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, আমীনের শব্দে মসজিদের মধ্যে গুঞ্জন ধ্বনির রব উঠতো। এখানে আমাদের তৃতীয় আরও ইমাম।
একটি মত আছে, তা এই যে, যদি মসজিদ ছোট হয় তবে মুকতাদী জোরে আমীন বলবে না। কেননা। তারা ইমামের কিরাআত শুনছে। আর যদি মসজিদ বড় হয় তবে আমীন জোরে বলবে, যেন মসজিদের প্রান্তে প্রান্তে ‘আমীনের’ শব্দ পৌছে যায়। আল্লাহই এ সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল জানেন।
মুসনাদ-ই- আহমাদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট ইয়াহুদীদের আলোচনা হলে তিনি বলেনঃ “আমাদের তিনটা জিনিসের উপর ইয়াহুদীদের যতটা হিংসা বিদ্বেষ আছে ততোটা হিংসা অন্য কোন বস্তুর উপর নেই। (১) জুমআ, আল্লাহ আমাদেরকে তার প্রতি হিদায়াত করেছেন ও পথ দেখিয়েছেন এবং তারা এ থেকে ভ্রষ্ট রয়েছে। (২) কিবলাহ্ এবং (৩) ইমামের পিছনে আমাদের আমীন বলা।
সুনান-ই-ইবনে মাজার হাদীসে রয়েছেঃ সালাম’ ও ‘আমীন’ ইয়াহুদীদের যতোটা বিরক্তি উৎপাদন করে অন্য কোন জিনিস তা করে না। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রাঃ) বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইয়াহূদীরা তোমাদের আমীনের উপর যত হিংসা করে অন্য কাজে ততোটা করে। তোমরা আমীন খুব বেশী বেশী বল।' এর সনদে বর্ণনাকারী তালহা বিন আমর উসূলে হাদীসের পরিভাষা অনুযায়ী দুর্বল। ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘আমীন, আল্লাহর মুমিন বান্দাদের উপর তার মোহর। হ্যরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “নামাযে ‘আমীন' বলা এবং প্রার্থনায় আমীন’ বলা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আমার প্রতি একটি বিশেষ দান, যা আমার পূর্বে অন্য কাউকে দান করা হয়নি। হাঁ, তবে এটুকু বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসার (আঃ) বিশেষ প্রার্থনার উপর হযরত হারুন (আঃ) আমীন বলতেন। তোমরা তোমাদের প্রার্থনা আমীনের উপর শেষ কর। তাহলে তোমাদের পক্ষেও আল্লাহ তা কবুল করবেন।” এ হাদীসটিকে সামনে রেখে কুরআন মাজীদের ঐ শব্দগুলো লক্ষ্য করুন যা হযরত মূসার (আঃ) প্রার্থনায় বলা হয়েছেঃ وَ قَالَ مُوْسٰى رَبَّنَاۤ اِنَّكَ اٰتَیْتَ فِرْعَوْنَ وَ مَلَاَهٗ زِیْنَةً وَّ اَمْوَالًا فِی الْحَیٰوةِ الدُّنْیَاۙ-رَبَّنَا لِیُضِلُّوْا عَنْ سَبِیْلِكَۚ-رَبَّنَا اطْمِسْ عَلٰۤى اَمْوَالِهِمْ وَ اشْدُدْ عَلٰى قُلُوْبِهِمْ فَلَا یُؤْمِنُوْا حَتّٰى یَرَوُا الْعَذَابَ الْاَلِیْمَ
অর্থাৎ এবং মূসা বললো -হে আমাদের প্রভু! আপনি ফিরআউনকে ও তার সভাসদবর্গকে ইহলৌকিক জীবনে সৌন্দর্য ও সম্পদ দান করেছেন যার ফলে সে অন্যদেরকে আপনার পথ হতে সরিয়ে নিয়ে বিপথে চালিত করছে; হে আমাদের প্রভু! আপনি তাদের ধন মাল ধ্বংস করুন এবং তাদের অন্তরকে কঠোর করে দিন, সুতরাং তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেখার পূর্ব পর্যন্ত ঈমান আনবে না।' (১০:৮৮) হযরত মূসার (আঃ) এ দু'আ ককূলের ঘোষণা নিম্নের এসব শব্দ দ্বারা করা হচ্ছেঃ قَالَ قَدْ اُجِیْبَتْ دَّعْوَتُكُمَا فَاسْتَقِیْمَا وَ لَا تَتَّبِعٰٓنِّ سَبِیْلَ الَّذِیْنَ لَا یَعْلَمُوْنَ অর্থাৎ তিনি বললেন তোমাদের দু'জনের প্রার্থনা মঞ্জুর করা হলো সুতরাং তোমরা দৃঢ় থাক এবং মুখদের পথে যেয়ো না।' (১০:৮৯)
দু'আ শুধু হযরত মূসা (আঃ) করেছিলেন এবং হযরত হারূণ (আঃ) শুধু ‘আমীন’ বলেছিলেন। কিন্তু কুরআনে এই দু'আর সংযোগ দু’জনের দিকেই করা হয়েছে। কতগুলো লোক একে প্রমাণ রূপে গ্রহণ করে বলে থাকেন যে, যে ব্যক্তি কোন দু'আর উপর আমীন বলে সে যেন নিজেই দু'আ করলো। এখন এ প্রমাণকে সামনে রেখে আবার তাঁরা কিয়াস করেন যে, মুকতাদীকে কিরাআত পড়তে হবে না। কেননা, তার সূরা ফাতিহার উপর আমীন’ বলাই কিরাআতের স্থলাভিষিক্ত হবে। তারা এ হাদীসটিকেও দলীল রূপে পেশ করেনঃ যার ইমাম থাকে, ইমামের কিরাআতই তার কিরাআত। (মুসনাদ-ই- আহমাদ)
হযরত বেলাল (রাঃ) বলতেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমীনে' আমার অগ্রবর্তী হবেন, না।' এঁরা এটা টেনে এনে যেহুরী নামাযে ইমামের পিছনে মুকতাদীর সূরা-ই-ফাতিহা না পড়া সাব্যস্ত করতে চান। আল্লাহ তাআলাই এসব বিষয়ে সবচেয়ে ভাল জানেন।
হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইমাম যখন غَیْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَیْهِمْ وَ لَا الضَّآلِّیْنَ বলার পর আমীন বলে এবং যমীনবাসীদের আমীনের সঙ্গে আসমান বাসীদের ‘আমীন' বলার শব্দও মিলিত হয়, তখন আল্লাহ বান্দার পূর্বের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেন। আমীন বলার দৃষ্টান্ত এরূপ যেমন, এক ব্যক্তি এক গোত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে যুদ্ধ করলো ও জয় লাভ করলো। অতঃপর যুদ্ধলব্ধ মাল জমা করলো। এখন সে অংশ নেয়ার জন্যে নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করলো। কিন্তু তার নাম বেরই হলো না এবং সে কোন অংশও পেলো না। এতে সে বিস্মিত হয়ে বললো -এ কেন হবে? তখন সে উত্তর পেলো তোমার আমীন’ না বলার কারণে।”
কুরআন অ্যাপ পেতে: https://gtaf.org/apps/quran
#GreentechApps
Comments
Post a Comment